মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিমের ধবল গরুর রয়েছে দুই শ বছরের ঐতিহ্য। কয়েক বছর আগেও কোরবানির ঈদের সময় রাজধানীসহ দেশের দূর-দূরান্ত থেকে মিরকাদিমের গরু কিনতে ক্রেতারা ছুটে আসতেন।
বেশ জনপ্রিয় ছিল মিরকাদিমের ধবল গরু। কিন্তু বিপুল চাহিদা থাকার পরও আগের মতো খামারি ও গৃহস্থরা এখন আর ধবল গরু লালন-পালন করেন না। অবশ্য ঐতিহ্য ধরে রাখতে এখনো কিছু খামারি ও গৃহস্থ ধবল গরু পালন করেন। চলতি বছর মিরকাদিম ও আশপাশের এলাকায় খামারিরা শতাধিক ধবল গরু কোরবানির জন্য প্রস্তুত করেছেন বলে জানিয়েছেন প্রান্তিক খামারিরা।
খামারিরা জানান, মিরকাদিম পৌর এলাকায় এখন আর আগের মতো গরু লালন-পালনের পর্যাপ্ত জায়গা নেই। নেই প্রাকৃতিক খাবারের উৎস। কমে যাচ্ছে ফসলি জমিও। গরু পালন করতে কাঁচা ঘাস ও খড় কিনে আনতে হয় দূর-দূরান্ত থেকে, যা যথেষ্ট ব্যয়বহুল।
অন্যদিকে খৈল, ভুষিসহ অন্যান্য দানাদার খাদ্যের দামও অনেক বেড়ে গেছে। সরকারিভাবে ধবল গরুর বীজ সংগ্রহ করে কৃত্রিম প্রজননের ব্যবস্থা না থাকায়ও দিন দিন কমছে ধবল গরুর সংখ্যা। কারণ এখন ধবল গরুর বাছুর পাওয়াও অনেক কঠিন। প্রান্তিক খামারিরা দেশের বিভিন্ন জেলায় যে পরিমাণ ধবল গরুর বাছুর উৎপাদন করেন, তার সংখ্যা নগণ্য।
জানা গেছে, মিরকাদিমের ধবল গরুর চাহিদা পুরান ঢাকায় বিশেষ করে রহমতগঞ্জের গনি মিয়ার হাটে সবচেয়ে বেশি।
কোরবানির ঈদ মানে পুরান ঢাকার মানুষের কোরবানির পশু হলো মিরকাদিমের ধবল গরু। দেড় লাখ টাকা থেকে শুরু করে সাড়ে তিন লাখ টাকায় বিক্রি হয় ধবল গরু। মিরকাদিমের ধবল গরু দেখতে খুব সুন্দর। সবল, সুদর্শন এই গরুগুলো ক্রেতাদের বিশেষ পছন্দের। গরুর শরীরের বিভিন্ন অংশে দেখা যায় গোলাপি বর্ণ, যা এদের অন্য গরু থেকে আলাদা করে দেয়। মিরকাদিমের গরু জনপ্রিয় হওয়ার আরো একটি কারণ এর মাংসের স্বাদ। অত্যন্ত সুস্বাদু এর মাংস। যাঁরা শৌখিন, কোরবানির ঈদে তাঁদের মিরকাদিমের গরু চাই-ই চাই। এই গরুগুলোর উচ্চতা তিন থেকে পাঁচ ফিট।
কথিত আছে একসময় দ্বিতীয় কলকাতা হিসেবে খ্যাতি ছিল মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিমের। উন্নতমানের চাল, ডাল, গরু উৎপাদনের কারণে মিরকাদিম এখনো প্রসিদ্ধ। ফলে কোরবানির ঈদের আগে দেশজুড়ে এ অঞ্চলের ধবল গরুর নাম শোনা যায়। শৌখিন মানুষ যাঁরা কোরবানি দেন, এই সময়টায় মিরকাদিমে তাঁদের আনাগোনা বেড়ে যায়।
স্থানীয়রা জানান, একসময় মিরকাদিমের প্রতি ঘরে বিশেষ এই জাতের ধবল গরু লালন-পালন করা হতো। এই অঞ্চলে একসময় ছিল বিভিন্ন তেল ও ধান-চালের মিল। ফলে কম দামে খৈল, ভুষি, খুদ, কুড়া পাওয়া যেত। বর্তমানেও চালের মিল এবং বিভিন্ন কলকারখানা থাকলেও খৈল, ভুষি, কুঁড়ার দাম অনেক চড়া। এ কারণে গরু পালন অনেক কমে গেছে। এ ছাড়া গৃহস্থ পরিবারগুলোর সদস্যদের অধিকাংশ বিদেশ চলে যাওয়ায় কিংবা অন্য পেশায় জড়িয়ে পড়ায় বর্তমানে ধবল গরু পালন অনেক কমে গেছে।
পুরান ঢাকার ঝুলনবাড়ী এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা শামসুদ্দিন গাজী প্রতিবছরের মতো এবারও মিরকাদিমে এসেছেন ধবল গরু কিনতে। কয়েকটি খামার ঘুরে তিনি পছন্দের চারটি ধবল গরু কিনেছেন।
শামসুদ্দিন গাজী বলেন, ‘বহু বছর আগে থেকে আমাদের পছন্দের শীর্ষে মিরকাদিমের ধবল গরু। প্রায় ৩৫ বছর ধরে আমি মিরকাদিমের ধবল গরু কিনে কোরবানি দিয়ে আসছি। তবে গত বছর ছয়টি গরু যে দামে কিনতে পেরেছিলাম, এবার চারটা কিনতেই সেই খরচ হয়ে গেছে। তবে গরুগুলো পছন্দসই হওয়ায় মনে দুঃখ নেই। এবার চারটি ধবল গরু কিনেছি সাড়ে ছয় লাখ টাকায়।’
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, আগে যেখানে মিরকাদিমে বাড়ি বাড়ি ধবল গরু লালন-পালন করা হতো। এখন সেখানে হাতে গোনা কয়েকটি বাড়িতে ধবল গরু লালন-পালন করা হচ্ছে। এ ছাড়া চার-পাঁচজন খামারি তাঁদের খামারে অর্ধশতাধিক ধবল গরু লালন-পালন করেছেন। এরই মধ্যে দূর-দূরান্ত থেকে আসা ক্রেতারা এসব গরু কিনে নিচ্ছেন। বর্তমানে খামার ও গৃহস্থ পরিবারে যেসংখ্যক ধবল গরু আছে তা চাহিদার ১০ ভাগও পূরণ করতে পারবে না বলে জানিয়েছেন খামারিরা।
স্থানীয় খামারি খোরশেদ আলম বলেন, ‘আগে ২০-৩০টা ধবল গরু লালন-পালন করতাম। এখন এক-দুটি ধবল গরু পালতেই কষ্ট। গো-খাদ্যের দাম বৃদ্ধি, জমির পরিমাণ কমে যাওয়ায় গরুর কাঁচা খাবারের ব্যাপক অভাব। ফলে পরিশ্রমের তুলনায় লাভ কম হওয়ায় ধবল গরু পালন কমিয়ে দিয়েছি।’
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা এম এ জলিল জানান, ধবল গরু মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিমের ঐতিহ্য। খামারিরা তাঁদের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে এখনো কিছু ধবল গরু পালন করেন। এই গরুর চাহিদা সবচেয়ে বেশি পুরান ঢাকায়। এর বাইরে ফরিদপুর, মাদারীপুরসহ অন্যান্য জেলায়ও এই গরুর চাহিদা রয়েছে।
তিনি আরো জানান, গাজীপুরের একটি ফার্মে ৮০টির বেশি ধবল ষাঁড় গরু আছে। সেখান থেকে বীজ সংগ্রহ করে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে ধবল গরুর সংখ্যা বাড়ানো যেতে পারে।