যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে শান্তি আলোচনা শুরুর আশাবাদ খুব দ্রুতই ম্লান হয়ে গেছে। উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড় থেকে একে অপরের ওপর সমঝোতার দায় চাপাচ্ছে, ফলে কূটনৈতিক অচলাবস্থা আরও গভীর হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি বলেছেন, গত ৮ এপ্রিল থেকে কার্যকর থাকা ইরানের সঙ্গে নাজুক যুদ্ধবিরতি এখন ‘লাইফ সাপোর্টে’ রয়েছে। একই সঙ্গে তার প্রশাসনের কর্মকর্তারাও ইঙ্গিত দিচ্ছেন, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে।
তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প এখন এমন এক অবস্থায় পড়েছেন যেখানে তার সামনে থাকা প্রতিটি পথই ঝুঁকিপূর্ণ। একদিকে যুদ্ধ বাড়ানোর ঝুঁকি, অন্যদিকে ইরানের কাছে কিছু ছাড় দিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা- দুই ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে তাকে।
যুদ্ধ না শান্তি- মধ্যবর্তী এক অনিশ্চয়তায় মধ্যপ্রাচ্য
বিশ্লেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য এখন এমন এক ধূসর পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে, যেখানে পুরোপুরি শান্তিও নেই, আবার পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধও নয়।
ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য সম্ভব হলেও, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ মার্কিন জনগণের কাছে পছন্দনীয় নয়। বিশেষ করে আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই যুদ্ধ রিপাবলিকান পার্টির জন্য বড় রাজনৈতিক বোঝা হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলে ট্রাম্পকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি কিংবা হরমুজ প্রণালীতে তেহরানের প্রভাব নিয়ে কিছুটা ছাড় দিতে হতে পারে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি রফতানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। এ কারণে অঞ্চলটির স্থিতিশীলতা বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হোয়াইট হাউসের সামনে কেবলই মন্দের ভাল বিকল্প
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্র দফতর ও জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের কর্মকর্তা অ্যালিসন মাইনর বলেন, “হোয়াইট হাউসের সামনে এখন এমন কিছু বিকল্প রয়েছে, যেগুলোর কোনওটিই ভালো নয়।”
বর্তমানে আটলান্টিক কাউন্সিলের প্রজেক্ট ফর মিডল ইস্ট ইন্টিগ্রেশনের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মাইনরের মতে, ইরান চাইছে- প্রথমে সব ধরনের সামরিক সংঘাত বন্ধ হোক, এরপর ধাপে ধাপে পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা চলুক।
তেহরান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, তারা তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করবে না। একই সঙ্গে তারা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালীতে নিজেদের প্রভাবের স্বীকৃতিও চায়।
ট্রাম্প ইতোমধ্যে ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাবকে ‘আবর্জনা’ বলে মন্তব্য করেছেন।
আবারও যুদ্ধের আশঙ্কা
গত রবিবার ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আরও সামরিক পদক্ষেপ প্রয়োজন হতে পারে। একই সময়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি।
ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত এখনও দেশটির ভেতরেই রয়েছে, যদিও গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমা হামলায় সেগুলোর একটি অংশ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকতে পারে। এছাড়া ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্কও পুরোপুরি অক্ষত রয়েছে বলে দাবি করেছেন নেতানিয়াহু।
তবে জার্মান মার্শাল ফান্ডের বিশিষ্ট গবেষক ইয়ান লেসারের মতে, নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে তা ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তিনি বলেন, “ঘটনা সবসময় পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোয় না। ইরানের নেতৃত্ব ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছে যে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি সহনশীল ও স্থিতিশীল।”
মার্কিন সামরিক সক্ষমতায় চাপ
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সঙ্গে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
টানা পাঁচ সপ্তাহ ইরানে বোমা হামলার পর মার্কিন গোলাবারুদের মজুত কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সংঘাতের কারণে চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ মোকাবিলার প্রস্তুতিও দুর্বল হয়ে পড়ছে।
হরমুজে উত্তেজনা ও উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্বেগ
ট্রাম্প ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে একটি উদ্যোগের ঘোষণা দিয়েছিলেন, যার লক্ষ্য ছিল হরমুজ প্রণালীতে আটকে থাকা জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা। তবে এর জবাবে ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় বলে অভিযোগ।
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলছেন, হামলাটি যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি ভঙ্গের পর্যায়ে পড়েনি। বিশ্লেষকদের মতে, এটিই প্রমাণ করে যে, ট্রাম্প প্রশাসন আবারও বড় ধরনের যুদ্ধে জড়াতে খুব বেশি আগ্রহী নয়।
এরপর মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প ওই উদ্যোগ স্থগিত করেন।
অভ্যন্তরীণ চাপ বাড়ছে ট্রাম্পের ওপর
ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্স/ইপসোসের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, দুই-তৃতীয়াংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন- যুক্তরাষ্ট্র কেন এই যুদ্ধে জড়িয়েছে, সে বিষয়ে ট্রাম্প পরিষ্কার ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
একই সঙ্গে জ্বালানি, গ্যাস ও সারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় জনগণের মধ্যে অর্থনৈতিক চাপও বাড়ছে।
বর্তমানে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ৩৬ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় অনেক কম। ফলে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন রিপাবলিকানদের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
শেষ পর্যন্ত কি সমঝোতার পথেই হাঁটবেন ট্রাম্প?
অ্যালিসন মাইনরের মতে, ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত এমন একটি সমঝোতার পথ খুঁজবেন, যেটিকে তিনি রাজনৈতিক বিজয় হিসেবে তুলে ধরতে পারবেন।
তার ভাষায়, “ট্রাম্প বাজার, জ্বালানি মূল্য ও মূল্যস্ফীতির প্রভাব বোঝেন। তিনি জানেন বর্তমান অচলাবস্থা দীর্ঘদিন ধরে রাখা সম্ভব নয়।”
তিনি আরও বলেন, ট্রাম্প সম্ভবত একই সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা এবং হরমুজ প্রণালীতে তেহরানের প্রভাব পুরোপুরি কমানোর লক্ষ্য অর্জন করতে পারবেন না। ফলে তাকে একটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতেই হবে।
মাইনরের ধারণা, শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প পারমাণবিক সমঝোতাকেই বেশি গুরুত্ব দেবেন।
ইরানের অবস্থান আরও কঠোর
ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক ডেনিস সিট্রিনোভিচের মতে, যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক চাপ সত্ত্বেও ইরান এখন নিজেকে তুলনামূলক শক্ত অবস্থানে দেখছে।
তার মতে, তেহরান বিশ্বাস করে যে, পশ্চিমা চাপ তাদের কৌশলগত অবস্থান বদলাতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং এই সংকটকে তারা নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে দেখছে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরানের আত্মবিশ্বাসের আড়ালেও অর্থনৈতিক চাপ ও সামরিক অবকাঠামোর ক্ষতির মতো দুর্বলতা রয়েছে।
ডেনিস সিট্রিনোভিচের ভাষায়, “ইরানের প্রতিক্রিয়া ট্রাম্পকে এমন এক পরিস্থিতিতে ফেলেছে, যেখানে কার্যকর বিকল্প খুব কম। আর যেগুলো আছে, সেগুলোও খারাপ থেকে আরও খারাপের দিকে।”