বিয়ের ১১ বছর পর কোল আলো করে আসে তাজিম। কিন্তু গত ২২ এপ্রিল হামে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারায় আট মাসের ছোট্ট সেই শিশুটি। সন্তান হারিয়ে ফারজানা-হেলাল দম্পতি পাগলপ্রায়। ৫৯ দিনে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে প্রাণ হারিয়েছে ৪৩২ শিশু। সন্তান হারানো এই বাবা-মায়ের আর্তনাদ কাঁপিয়ে দিয়েছে দেশকে। সবার মনে প্রশ্ন, আর কত শিশু মৃত্যু দেখতে হবে? হঠাৎ কেন প্রাণঘাতী হয়ে উঠল হাম! টিকার অপর্যাপ্ততা, অপুষ্টি নাকি অব্যবস্থাপনা- কার দায়ে ঝরে পড়ছে নিষ্পাপ প্রাণ। পুরো বিষয়টি তদন্ত করে দায়ীদের শাস্তির মুখোমুখি করার দাবি জানান বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে জানা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও আট শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একটি শিশু নিশ্চিতভাবে হামে এবং সাত শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। হামের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত আক্রান্ত হয়ে ৬৯ শিশু মারা গেছে। আর হামের উপসর্গ নিয়ে প্রাণ হারিয়েছে ৩৬৩ শিশু। মোট মৃত্যু হয়েছে ৪৩২ শিশুর। হাম নিয়ন্ত্রণে আনতে দেশব্যাপী টিকা দিচ্ছে সরকার। টিকা ক্যাম্পেইন সফল হলে মে মাসের শেষ কিংবা জুনের প্রথম দিকে হাম নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন চিকিৎসকরা। এ ব্যাপারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক উপদেষ্টা পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক ডা. এম মুজাহেরুল হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘দেশে প্রতিদিন হামে আক্রান্ত হয়ে শিশুর মৃত্যু হচ্ছে। এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী কারা? কার অবহেলায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এ বিষয়টি জানা খুব জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে। সরকারের উচিত দায়ীদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনা। প্রতিবেশী দেশ মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কাতে হামের সংক্রমণ নেই। পূর্ব তিমুর টিকার মাধ্যমে হাম নির্মূল করেছে। বাংলাদেশে হামে কেন এত মৃত্যু, কারণ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।’
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টিকা কেনার পুরো ব্যবস্থা বদলে ফেলা, ভিটামিন এ ও কৃমিনাশকের ঘাটতি, সর্বোপরি ইউনিসেফের দফায় দফায় সতর্কবার্তা উপেক্ষা করার কারণেই হামের সংক্রমণ মৃত্যুর মিছিলে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। শিশুদের প্রাণের বিনিময়ে দিতে হচ্ছে এই ভুলের মাশুল। শুধু চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট নয়, বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতারাও আওয়াজ তুলেছেন এই শিশু মৃত্যুর বিরুদ্ধে।
হামে শিশু মৃত্যুর ঘটনায় গত মঙ্গলবার রাজধানীর মহাখালীতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করে স্মারকলিপি দিয়েছেন সিপিবি ঢাকা মহানগর উত্তর কমিটির নেতারা। আগামী ১৯ মের মধ্যে হাম পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ঘেরাও, অবস্থান কর্মসূচিসহ আরও কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন নেতারা। হামে শিশু মৃত্যুর জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে দায়ী করে সমাবেশে বক্তারা দ্রুত তদন্ত ও বিচারের দাবি জানান। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সভাপতি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আসলেই ভঙ্গুর। বিগত সরকার স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছে। বর্তমানে হামে আক্রান্ত হয়ে অনেক শিশু মারা যাচ্ছে-এজন্য এই স্বাস্থ্য ব্যবস্থা দায়ী। তবে বর্তমান সরকার বিষয়টা অনেকটা গোপন করতে চাচ্ছে। এজন্য আমরা সরকারকে হামসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত বিষয়ে আহ্বান জানিয়েছি, যাতে সঠিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘হাম এখন এমন পর্যায়ে চলে গেছে, প্রতিদিন অনেক শিশু মারা যাচ্ছে। এর জন্য বিশেষ অবস্থা ঘোষণা করা দরকার। একই সঙ্গে কিছু হাসপাতালকে ডেডিকেটেড ঘোষণা দিয়ে স্বাস্থ্য সেবা বাড়াতে হবে। সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।’ ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার জন্য বিগত সরকার দায়ী। এর জন্য অবশ্যই আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে বর্তমান সরকারও একটু গাফিলতি করছে। সরকারকে এবিষয়ে আরও জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে।’ বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘হামের টিকা নিয়ে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার কোনো মনোযোগ দেয়নি। তারা দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে। তারা কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারে না। হামে এর আগে এমন গণমৃত্যু দেখেনি বাংলাদেশ। এজন্য অন্তর্বর্তী সরকার দায়ী।’ তিনি বলেন, ‘বর্তমান বিএনপি সরকার প্রায় তিন মাস হলো ক্ষমতায় এসেছে। এটাকে মহামারি দুর্যোগ হিসেবে দেখে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কীভাবে দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা যায় সেটাকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করতে হবে। আপত দৃষ্টিতে যতটুকু বোঝা যাচ্ছে এখন আর টিকার সংকট নেই।’ বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘হামের প্রাদুর্ভাব স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর প্রয়োজনীয় কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। যার ফলে এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের অচল অবস্থা একদিনে সৃষ্টি হয়নি। বর্তমান সরকার সবেমাত্র ক্ষমতায় এসেছে। সরকার টিকার ব্যবস্থা করছে। কিন্তু হামের সংক্রমণ ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা এখনই গ্রহণ করতে হবে।’ জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমরা বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছি। ওই কমিটির সুপারিশ ও পরামর্শ অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’