শিক্ষাক্রম নতুনভাবে সাজানো এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা ও উদ্ভাবনের দিকে মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) আয়োজিত ‘বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা রূপান্তর : টেকসই উৎকর্ষতার রোডম্যাপ’ শীর্ষক জাতীয় কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবারের মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) সফর করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কর্মশালায় বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে, খুব সম্ভবত বাস্তবতা হচ্ছে, একবিংশ শতাব্দীতে শিক্ষা, গবেষণা ও জ্ঞানের উৎকর্ষ অর্জনের ক্ষেত্রে বিশ্ববিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিংয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় এখনো মনে হয় প্রত্যাশিত উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেনি। র্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে সাধারণত গবেষণা, প্রকাশনা, পাবলিকেশন, সাইটেশন এবং উদ্ভাবনকে মনে হয় বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। সে ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান কোথায়, এ বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের শিক্ষাবিদরা নিশ্চয়ই আরও চিন্তাভাবনা করবেন।’ তিনি বলেন, ‘শুধু পুঁথিগত শিক্ষাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা এবং উদ্ভাবনের দিকে মনোযোগ না দিলে মনে হয় প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে আমাদের টিকে থাকা কিছুটা হলেও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে।’
দিনব্যাপী এ কর্মশালায় দেশের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থাকে সময়োপযোগী ও টেকসই করার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। এতে অংশ নেন মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, শিক্ষাবিদ, গবেষক, আমলা ও শিল্প খাতের প্রতিনিধিরা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এবং প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন। গবেষণা কার্যক্রমে সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি অ্যালামনাইদের সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘আমি যতটুকু জানি, ব্রিটেনসহ বিশ্বের অনেক দেশেই যারা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই, তাদের অনেকেই কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও উদ্ভাবন কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে সাধারণত পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকেন। এজন্যই অনেকে বলে থাকেন শিক্ষার্থীরা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ, আর অ্যালামনাইরা তার মেরুদণ্ড।’ তিনি দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও গবেষণা উন্নয়নে সম্পৃক্ত করার আহ্বানও জানান।
শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক ও বাস্তবমুখী করার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান সরকার মনে করে প্রাথমিক সিলেবাস থেকে শুরু করে উচ্চতর পর্যায় পর্যন্ত আমাদের শিক্ষা কারিকুলামগুলো একটু নতুনভাবে সাজানো বোধ হয় এখন সময়ের দাবি।’ তিনি আরও বলেন, ‘উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে সময়োপযোগী করতে বর্তমান সরকার অ্যাপ্রেন্টিসশিপ, ইন্টার্নশিপ ও ইন্ডাস্ট্রি একাডেমিতে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।’
স্কুল পর্যায়ে কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ইনোভেশন গ্র্যান্ট, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ইনস্টিটিউট ও সায়েন্স পার্ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
বক্তব্যে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্ব এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে পা দিয়েছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চলমান এই সময় এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স ও অটোমেশন, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, বায়োটেকনোলজি সাইবার সিকিউরিটি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, বিগ ডেটা, ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স, ন্যানোটেকনোলজি, পঞ্চম প্রজন্মের ওয়্যারলেস প্রযুক্তি এসব উন্নত প্রযুক্তি একদিকে আমাদের চিন্তার জগৎ নিয়ন্ত্রণ করছে, অপরদিকে শাসন করছে মানুষের কর্মক্ষেত্র বা কর্মসংস্থান।’
তিনি বলেন, ‘মেধা পাচার রোধ করে মেধার বিকাশ, মেধা লালন করে আমরা ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে চাই একসঙ্গে।’ বিশেষ অতিথির বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, ‘১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে দেশমাতা বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের নেতৃত্বে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাসের মাধ্যমেই দেশে ১১৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।’
বর্তমানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৫৭-তে দাঁড়িয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘উচ্চশিক্ষায় আমরা সংখ্যার দিক থেকে এগিয়ে গেলেও গুণগত মান বা কোয়ালিটির দিক থেকে কতটুকু অর্জন করতে পেরেছি, তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।’
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান শিক্ষকদের বিদেশে ছুটি কাটানোর পরিবর্তে দেশে থেকে পাঠদানের সুব্যবস্থা করেছিলেন। তিনি আরও বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও একইভাবে শিক্ষাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন এবং তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী আগামীর শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আনতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। কর্মশালার উদ্বোধন শেষে দুপুর পৌনে ১২টার দিকে সিনেট ভবন থেকে হেঁটে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক মুজাফফর আহমদ চৌধুরী মিলনায়তনে যান প্রধানমন্ত্রী। সেখানে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় অংশ নেন তিনি। এ সময় ছাত্রদলের নেতা-কর্মীসহ বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর উপস্থিতি দেখা যায়। মতবিনিময় সভায় এক শিক্ষার্থীর প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে পিছিয়ে পড়ছে। এর অন্যতম কারণ শিক্ষক নিয়োগ যেভাবে হওয়া উচিত ছিল, অতীতে সেভাবে হয়নি। আমি শুনেছি ও পত্রপত্রিকায় পড়েছি, নিয়োগে রাজনীতি বেশি প্রাধান্য পেয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, মেধা ও ফলাফলের ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব।
শিক্ষকদের পদোন্নতিতেও রাজনৈতিক বিবেচনার প্রভাব ছিল বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় একটি ভাষা শেখারও আহ্বান জানাচ্ছি, যাতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ে।’
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার গুরুত্ব তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো রাজনীতি করবে, এটি স্বাভাবিক। তবে রাজনীতির মূল কেন্দ্র হওয়া উচিত সংসদ। আমরা রাজপথের রাজনীতিতে অনেক কিছু করেছি। কিন্তু এখন স্থিতিশীলতা আসতে হবে। রাজনীতিকে সংসদে যেতে হবে। শুধু রাজপথে হইচই করে কিছু গড়ে তোলা যাবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘কিছু গড়ে তুলতে হলে স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। আলোচনা প্রয়োজন। চিন্তা করে কাজ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আপনাদের সহযোগিতা প্রয়োজন। কারণ ভবিষ্যৎ আপনাদের। এসব বিষয়ে আপনাদের শক্ত হতে হবে এবং প্রয়োজন হলে প্রতিবাদে সোচ্চার হতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ভবিষ্যৎ আপনাদের, দেশকে এগিয়ে নিতে আপনাদেরই নেতৃত্ব দিতে হবে।’ তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, অপচয় ও অনিয়ম দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করেছে। বড় বড় প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপরই পড়ে উল্লেখ করে তিনি দুর্নীতিবিরোধী সামাজিক সচেতনতা ও মানসিকতার পরিবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এ লক্ষ্যে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। স্বাগত বক্তব্যে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় একটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগ, যা দেশের উচ্চশিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ওআইসিভুক্ত দেশের রাষ্ট্রদূতদের সাক্ষাৎ : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত ওআইসিভুক্ত (অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন) দেশসমূহের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনাররা সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন।
গতকাল দুপুরে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি জাহিদুল ইসলাম রনি এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করায় ওআইসি সদস্যভুক্ত দেশগুলোর পক্ষ থেকে তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানানো হয়। সদস্য রাষ্ট্রগুলো বাংলাদেশের সঙ্গে বিনিয়োগ, বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, টেক্সটাইল, ওষুধশিল্পসহ নানান খাতে সম্পর্ক জোরদার করার পাশাপাশি বাংলাদেশের পাশে থাকার দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করে।
বৈঠকে সৌদি আরব, তুরস্ক, ফিলিস্তিন, আলজেরিয়া, ব্রুনাই, মিসর, ইন্দোনেশিয়া, কুয়েত, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, মরক্কো, ওমান, পাকিস্তান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার এবং ইরান, ইরাক ও লিবিয়ার হেড অব মিশন উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, পররাষ্ট্র সচিব এম ফরহাদুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন উপস্থিত ছিলেন।