ট্রাম্প প্রশাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে মাদুরোর পক্ষে রায় নিউ ইয়র্ক আদালতের

Reporter Name / ৪ Time View
Update : রবিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০২৬

মাদক পাচার মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া সচল রাখতে ভেনেজুয়েলার কারাবন্দি সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর আইনি লড়াইয়ের খরচ মেটানোর পথ প্রশস্ত করল যুক্তরাষ্ট্র। দীর্ঘ টালবাহানার পর ওয়াশিংটন তাদের আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় বিশেষ পরিবর্তন আনতে সম্মত হয়েছে, যাতে ভেনেজুয়েলার বর্তমান সরকার মাদুরোর আইনজীবীর পাওনা পরিশোধ করতে পারে।

গত শুক্রবার নিউ ইয়র্কের একটি আদালতের নথিতে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসে। এর আগে নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে মাদুরোর আইনজীবী নিয়োগের বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় পুরো মামলাটিই খারিজ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল।

গত ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে এক নাটকীয় অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনীর হাতে নিজ বাসভবন থেকে সস্ত্রীক বন্দি হন ৬৩ বছর বয়সী মাদুরো এবং তার ৬৯ বছর বয়সী স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস। গ্রেফতারের পর তাদের সরাসরি নিউ ইয়র্কে নিয়ে আসা হয়, যেখানে তাদের বিরুদ্ধে নার্কো-টেরোরিজম বা মাদক-সন্ত্রাসবাদের ষড়যন্ত্রসহ গুরুতর একাধিক অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। বর্তমানে তারা ব্রুকলিনের একটি কারাগারে বন্দি রয়েছেন। তবে আদালতের শুনানিতে মাদুরো ও ফ্লোরেস নিজেদের সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

মাদুরোর প্রধান কৌঁসুলি ব্যারি পোল্যাক গত ফেব্রুয়ারিতে ম্যানহাটনের জেলা জজ আলভিন হেলারস্টাইনের কাছে মামলাটি খারিজের আবেদন জানিয়েছিলেন। তার যুক্তি ছিল, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ভেনেজুয়েলা সরকার তার ফি পরিশোধ করতে পারছে না, যা একজন আসামির সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থী। পোল্যাক দাবি করেন, এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকলে মাদুরো তার পছন্দের আইনজীবী নিয়োগের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, যা মার্কিন সংবিধানের ষষ্ঠ সংশোধনীর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আইনজীবীরা আদালতকে জানান, মাদুরো বা ফ্লোরেস ব্যক্তিগতভাবে এই বিপুল আইনি খরচ বহন করতে সক্ষম নন, তবে ভেনেজুয়েলার বর্তমান সরকার এই ব্যয়ভার গ্রহণে প্রস্তুত রয়েছে।

মার্কিন বিচারব্যবস্থায় নাগরিকত্ব নির্বিশেষে সকল আসামির জন্য সাংবিধানিক অধিকার সমানভাবে প্রযোজ্য। গত ২৬ মার্চের এক শুনানিতে বিচারক হেলারস্টাইন মামলাটি সরাসরি খারিজ করতে রাজি না হলেও সরকারের অনড় অবস্থানের প্রতি সংশয় প্রকাশ করেন। তিনি ইঙ্গিত দেন যে, একজন আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার রক্ষা করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রাথমিক দায়িত্ব। বিবাদীপক্ষের যুক্তি ছিল যে, কোনো ব্যক্তিকে বিচারের মুখোমুখি করে আবার তার আইনি সহায়তার পথ বন্ধ করে দেওয়া ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। বিচারকের এই পর্যবেক্ষণ শেষ পর্যন্ত মার্কিন প্রশাসনকে তাদের কঠোর অবস্থান থেকে পিছু হটতে বাধ্য করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আদালতে সরকারি কৌঁসুলি কাইল উইরশবা যুক্তি দিয়েছিলেন যে, ভেনেজুয়েলার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলো জাতীয় নিরাপত্তা এবং বৈদেশিক নীতির স্বার্থে গৃহীত হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন, বিচার বিভাগ ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টকে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের নির্দেশ দিতে পারে না, কারণ এটি সম্পূর্ণভাবে নির্বাহী বিভাগের এখতিয়ার। তবে বিচারক হেলারস্টাইন প্রসিকিউশনের এই যুক্তির জবাবে বলেন, মাদুরোর ক্ষমতাচ্যুতির পর থেকে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটেছে। বিশেষ করে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের নেতৃত্বে কারাকাস ও ওয়াশিংটনের মধ্যে বরফ গলতে শুরু করার বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করেন।

হেলারস্টাইন শুনানিতে স্পষ্ট করে বলেন, মাদুরো এবং ফ্লোরেস বর্তমানে মার্কিন হেফাজতে রয়েছেন এবং তারা এখন আর যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য কোনো হুমকি নন। তিনি মন্তব্য করেন, আসামিরা এখানে আছেন এবং তারা বন্দি। এই মুহূর্তে সবকিছুর ঊর্ধ্বে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো আসামির সাংবিধানিক কাউন্সিল বা আইনজীবী পাওয়ার অধিকার। বিচারকের এই কঠোর অবস্থানের মুখে মার্কিন প্রশাসন শেষ পর্যন্ত নমনীয় হতে বাধ্য হয় এবং ভেনেজুয়েলা সরকারকে আইনি ফি প্রদানের অনুমতি দিয়ে নিষেধাজ্ঞা সংশোধনের পথে হাঁটে।

মাদুরোর বিরুদ্ধে এই আইনি লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে। সে সময় মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের অভিযোগ এনে ভেনেজুয়েলার ওপর দফায় দফায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ওয়াশিংটন। ২০১৮ সালে মাদুরোর পুনর্নির্বাচনকে জালিয়াতি হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। এর ধারাবাহিকতায় ২০২০ সালে মাদক পাচারের অভিযোগে মাদুরোর বিরুদ্ধে পুরস্কার ঘোষণা এবং পরবর্তীতে তাকে বন্দি করার মাধ্যমে দুই দেশের উত্তেজনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। দীর্ঘদিনের সেই রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এখন নিউ ইয়র্কের আদালতের কাঠগড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে।

অন্যদিকে, মাদুরো শুরু থেকেই তার বিরুদ্ধে আনা মাদক পাচারের অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আসছেন। তার দাবি, ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলসম্পদ দখল করার অজুহাত হিসেবেই যুক্তরাষ্ট্র এই সাজানো মামলাটি তৈরি করেছে। যদিও ক্ষমতা হারানোর পর তিনি এখন বন্দি, তবু আদালতের এই নতুন সিদ্ধান্তের ফলে তিনি অন্তত তার পছন্দের আইনজীবীর মাধ্যমে লড়তে পারবেন। মাদক পাচার মামলার এই মোড় পরিবর্তনের ফলে এখন দেখার বিষয় যে, মার্কিন আদালতে ভেনেজুয়েলার এই একসময়ের ক্ষমতাধর নেতার ভাগ্য কোন দিকে মোড় নেয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
deneme bonusu veren siteler - canlı bahis siteleri - casino siteleri casino siteleri deneme bonusu veren siteler canlı casino siteleri error code: 520
deneme bonusu veren siteler - canlı bahis siteleri - casino siteleri casino siteleri deneme bonusu veren siteler canlı casino siteleri error code: 520