রাজশাহীর বাঘায় বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির নামে নকল ওষুধ তৈরির কারখানার সন্ধান পাওয়ার পর একের পর এক নতুন তথ্য সামনে আসছে। প্রশাসনের অভিযানে কারখানায় কর্মরত সাত শ্রমিককে আটক করা হলেও পাওয়া যায়নি প্রকৃত মালিক কিংবা মূল পরিচালনাকারীদের। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এক লাখ টাকা জরিমানা আদায় করে সাত শ্রমিকের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে জরিমানার অর্থ কারা পরিশোধ করেছেন এবং এর উৎস কী, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) বিকেলে বাঘা উপজেলার বাউসা ইউনিয়নের তেঁতুলিয়া বাজার থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার উত্তরে একটি পুরোনো বাড়িতে অভিযান চালিয়ে নকল ওষুধ তৈরির কারখানার সন্ধান পায় উপজেলা প্রশাসন। এ সময় কারখানায় কর্মরত সাত শ্রমিককে পাওয়া যায়। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এক লাখ টাকা জরিমানা করে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে কারখানার প্রকৃত মালিক, অর্থের জোগানদাতা কিংবা মূল পরিচালনাকারীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে কয়েকটি প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সাত শ্রমিকের বিরুদ্ধে কী অভিযোগে জরিমানা করা হয়েছে? তাঁরা নিজেরা এক লাখ টাকা পরিশোধ করেছেন, নাকি কারখানার মালিকপক্ষ কিংবা অন্য কেউ এই অর্থ দিয়েছেন? জরিমানার অর্থের উৎস এবং তাঁদের নাম-পরিচয় যথাযথভাবে নথিভুক্ত করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও জানতে চান সচেতন নাগরিকেরা।
স্থানীয় কয়েকটি সূত্রের দাবি, নকল ওষুধ তৈরির এই কারবারের পেছনে প্রভাবশালী একটি মহলের আশ্রয়-প্রশ্রয় থাকতে পারে। তবে এসব দাবির পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, নকল ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। তাই শুধু কারখানা সিলগালা করার পাশাপাশি এর সঙ্গে জড়িত প্রকৃত মালিক, অর্থের জোগানদাতা ও সহযোগীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি।
এদিকে বৃহস্পতিবার সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, সিলগালা করা বাড়িটির বারান্দায় বসে পাহারা দিচ্ছেন বাউসা ইউনিয়নের গ্রাম পুলিশ হাসমত আলী। তিনি জানান, রাতে ওই বাড়িতে পাঁচজন গ্রাম পুলিশ পাহারায় ছিলেন। সকালে তিনি একাই দায়িত্ব পালন করছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাড়ির মালিক হায়দার আলী চাকরির সুবাদে ঢাকায় থাকেন। তাঁর ভাই শামীম ও মা রিনা বেগম জানান, প্রায় ছয় মাস আগে নাটোর এলাকার রেজাউল করিম মাসিক আট হাজার টাকা ভাড়ায় বাড়িটি নেন। তবে বাড়ির ভেতরে কী ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হতো, সে বিষয়ে তাঁরা কিছু জানেন না বলে দাবি করেন।
তাঁরা আরও জানান, রেজাউল করিম ‘নাটোর ভেষজ মার্ট’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্সের ফটোকপি বাড়ির মালিকের কাছে জমা রেখেছিলেন। লাইসেন্সটি নাটোরের খোলাবাড়িয়া ইউনিয়ন থেকে নেওয়া হয়েছে বলে তাঁদের দাবি। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে রেজাউল করিমের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।
এ বিষয়ে বাঘা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নুসরাত জাহান অন্যন্যা জানান, থানা-পুলিশের সহযোগিতায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অভিযানে বিভিন্ন কোম্পানির নামে তৈরি ভেজাল ওষুধ জব্দ করা হয়েছে এবং কারখানাটি সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, নকল ওষুধ তৈরির বিষয়টি ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেবেন। অভিযানে আটক সাত ব্যক্তির নাম জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাঁদের নাম পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া যাবে।
তবে কারখানার প্রকৃত মালিক ও মূল পরিচালনাকারীদের শনাক্ত করা, জরিমানার অর্থের উৎস এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, সেদিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছেন স্থানীয়রা।