বগুড়া অঞ্চলে যমুনা নদী। তার ভয়াল রূপ দেখা যায় বর্ষাকাল এলে। শুরু হয় ভয়ংকর ভাঙন। সেই ভাঙন রোধে ২০ বছর ধরে চলছে নানান ধরনের আয়োজন। এ ভাঙন রোধে এই সময়ে দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। ফল শূন্য। যেন সব অর্থ যমুনার জলে ভেসে গেছে। গড়ে প্রায় প্রতি বছর ১০০ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। তবে সেই অর্থের একটা বড় অংশ দুর্নীতির মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আবারও নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
গত দেড় যুগে যমুনার করালগ্রাসী থাবায় বিলীন হয়েছে বসতভিটা ও ফসলি জমি। নিঃস্ব হয়েছে হাজারো পরিবার। বগুড়া অংশে যমুনা ৪৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে অতিবাহিত হলেও ডান তীর রক্ষায় কাজ হয়েছে ১৯ কিলোমিটার। বাকি ২৬ কিলোমিটার নদী এখন পর্যন্ত অরক্ষিত থাকায় ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। শুধু ডান তীর নয়, নদীর দুই পাড়ও ভাঙছে সমানতালে। ভাঙন রোধে বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ছয়টি স্পার, একটি গ্রোয়েন বাঁধ ও দুটি হার্ডপয়েন্ট নির্মাণ করেছে। এ ছাড়া ছয়টি ক্রসবার ও একটি ফিসপাস নির্মাণ করা হয়েছে। এদিকে বগুড়া পাউবোর কর্মকর্তারা বলছেন, ভাঙন রোধে প্রায় সাড়ে ৯ কিলোমিটার তীর প্রতিরক্ষার জন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে নতুন করে ‘বগুড়া জেলার যমুনা নদীর তীর সংরক্ষণ ও পুনর্বাসন’ নামে একটি প্রকল্পের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন হলে যমুনার ডান তীর ভাঙন কমানো সম্ভব হবে।
বাংলাপিডিয়া মতে তিব্বতের মানসসরোবর ও কৈলাস পর্বতের মধ্যবর্তী পার্খা নামক গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র থেকে ১৪৫ কিমি অদূরে অবস্থিত চেমায়ুং-দুং নামক হিমবাহ থেকে ব্রহ্মপুত্র নদের উৎপত্তি। সুবিশাল বঙ্গীয় সমভূমিতে পতিত হওয়ার আগে আসামে ব্রহ্মপুত্র নদ ডিহাং নামে অভিহিত। কুড়িগ্রাম জেলার মধ্য দিয়ে এটি বাংলাদেশে ঢুকেছে। গঙ্গাসঙ্গমের আগ পর্যন্ত সাংপো-ব্রহ্মপুত্র-যমুনার সম্মিলিত দৈর্ঘ্য প্রায় ২ হাজার ৭০০ কিমি। বাংলাদেশ ভূখণ্ডে ব্রহ্মপুত্র-যমুনার দৈর্ঘ্য ২৭৬ কিমি, যার মধ্যে যমুনার দৈর্ঘ্য ২০৫ কিমি।
এই যমুনা সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইল পার হয়ে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের কাছে পদ্মার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। বগুড়ার সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া যমুনা বগুড়া অংশে ৪৫ কিলোমিটার জুড়ে প্রবাহিত। ২০০০ থেকে শুরু করে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ২০ বছরে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এ টাকায় যে কাজ হয়েছে, তার মধ্যে সারিয়াকান্দির হাটশেরপুর ইউনিয়নের হাসনাপাড়া বাজারের সামনে ৫৫৮ মিটার স্পার নির্মাণ করা হয় ২০০২ সালে। এ ইউনিয়নের নিজবলাইল বাজারের সামনেও একই সঙ্গে একই ধরনের আরও একটি স্পার নির্মাণ করা হয় ওই বছরে। এ ছাড়া ধুনট সীমানা থেকে হাসনাপাড়া বাজার পর্যন্ত ২০০৮ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত যমুনার ডান তীর সংরক্ষণের কাজ করা হয়। এর মধ্যে ২০০৬ সালে কালীতলা গ্রোয়েন বাঁধ থেকে পারতিত পরল পর্যন্ত ২ হাজার মিটার এবং দেবডাঙা পয়েন্টে ১ হাজার ২০০ মিটার তীর সংরক্ষণ কাজ হয়েছে। ২০১৬ সালে রৌহাদহ থেকে মথুরাপাড়া পর্যন্ত ৬ কিলোমিটার তীর সংরক্ষণ কাজ হয়।
পাউবো বগুড়ার উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. হুমায়ন কবির জানান, ২৬ কিলোমিটার নদী এখন পর্যন্ত অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। যেখানে ভাঙন অব্যাহত আছে। ভাঙনকবলিত এলাকাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সোনাতলা উপজেলার পাকুল্ল্যা, সারিয়াকান্দি উপজেলার কামালপুর, ধুনট উপজেলার শহরাবাড়ী ও ভান্ডারবাড়ী এলাকা। বর্তমানে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃর্ষ্টিতে এসব এলাকার বসতবাড়ি ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। এসব এলাকায় ভাঙন রোধে সাড়ে ৯ কিলোমিটার নদীতীর প্রতিরক্ষার জন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে ‘বগুড়া জেলার যমুনা নদীর তীর সংরক্ষণ ও পুনর্বাসন’ নামে একটি প্রকল্পের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।