সংসদের কেনাকাটায় হরিলুট

Reporter Name / ৩ Time View
Update : শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬

মাত্র ৪ হাজার টাকার ব্যাগের দাম ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৪০০ টাকা। দামি ব্র্যান্ডের নাম লেখা থাকলেও দেওয়া হয়েছে নিম্নমানের ব্যাগ। লোগো লাগানো হয়েছে আলাদাভাবে।

একইভাবে একটি ৩ হাজার টাকার কার্ড রিডারের দাম নেওয়া হয়েছে ২১ হাজার ৫০০ টাকা। আর ৩ লাখ ৩৮ হাজার টাকার ডিজিটাল স্টিল এসএলআর ক্যামেরার বডির দাম নেওয়া হয়েছে ৭ লাখ ৯ হাজার ৫০০ টাকা। এ ধরনের চারটি ক্যামেরার বডি দেওয়া হয়েছে ২৮ লাখ ৩৮ হাজার টাকায়। সব মিলিয়ে ছবি তোলার জন্য যে সেট কেনা হয়েছে তার জন্য সরকারের কাছ থেকে দাম নেওয়া হয়েছে ৫৮ লাখ ৪৪ হাজার ১৩০ টাকা। প্রকৃতপক্ষে এসব আইটেমের দাম সব মিলিয়ে ২০ লাখের কম।

অবিশ্বাস্য হলেও এমন হরিলুটের ঘটনা ঘটেছে জাতীয় সংসদে। যেখানে প্রায় প্রতিদিন দুর্নীতি, লুটপাটের বিরুদ্ধে কথা বলা হয়। জাতীয় সংসদের অধিবেশনের সময় ছবি তোলার জন্য অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে এ কেনাকাটার কাজ শেষ করা হয়েছে। ৩০ দিনের মধ্যে ক্যামেরা ও সংশ্লিষ্ট আইটেম সরবরাহের নির্দেশনা থাকলেও মাত্র ১৯ দিনের মধ্যেই সরবরাহ করা হয়। আর এসব কিছু নেপথ্যে থেকে তত্ত্বাবধান করেছেন সংসদ সচিবালয় থেকে সদ্য বিদায় নেওয়া সচিব কানিজ মাওলা। কাগজে কলমে সব নিয়ম রক্ষা করেই রীতিমতো হরিলুট করা হয়েছে সংসদ সচিবালয়ের প্রথম কেনাকাটায়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর এটাই সংসদ সচিবালয়ের প্রথম কেনাকাটা বলে জানিয়েছে সংসদ সচিবালয়। ১২ মার্চ সংসদের যাত্রা হয়। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে কেনার আদেশ দেওয়া হয় ২৫ মার্চ। আর সরবরাহ করা হয় ১৫ এপ্রিল।

সব মিলিয়ে ক্যামেরাসংশ্লিষ্ট ১২টি আইটেম কেনা হয়েছে। চারটি ক্যামেরা বডির পাশাপাশি চারটি ভিন্ন ধরনের ক্যামেরা লেন্স কেনা হয়েছে। ২৪-৭০ এমএম ফোকাল লেন্থের তিনটি লেন্স কেনা হয়েছে ৩৭ লাখ ৪১ হাজার টাকায়। প্রতিটির দাম নেওয়া হয়েছে ১ লাখ ২৪ হাজার ৭০০ টাকা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, এসবের বাজারমূল্য সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার টাকা। ২৪-১২০ এমএম ফোকাল লেন্থের একটি লেন্স কেনা হয়েছে ২ লাখ ১০ হাজার ৭০০ টাকায়। বাজারমূল্য ১ লাখ ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা। ১৪-২৪ ফোকাল লেন্থের একটি লেন্স কেনা হয়েছে ৪ লাখ ৪৭ হাজার ২০০ টাকায়। সংশ্লিষ্টদের মতে এর বাজারমূল্য সর্বোচ্চ ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা। ১০০-৪০০ এমএমের একটি লেন্স কিনতে খরচ করা হয়েছে ৫ লাখ ৭৬ হাজার ২০০ টাকা। ক্যামেরাসংশ্লিষ্টদের মতে এ লেন্সের বাজারমূল্য সর্বোচ্চ ২ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। ক্যামেরা সেটের জন্য ছয় পিস স্পিডলাইট (ফ্ল্যাশ) কেনা হয়েছে ৬ লাখ ৬৩ হাজার ৩০০ টাকায়। অর্থাৎ প্রতিটির দাম নেওয়া হয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ৫০ টাকা। তবে এর বাজারমূল্য সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। একইভাবে ৩ লাখ ২২ হাজার ৫০০ টাকায় কেনা হয়েছে সিফেক্সপ্রেসের ১২৮ জিবির ১০টি মেমোরি কার্ড, ৮১ হাজার ৭০০ টাকায় কেনা হয়েছে এসডি/এসডিএইউসির (১২৮ জিবি) ১০টি মেমোরি কার্ড। চজার পিস কার্ড রিডার কেনা হয়েছে ৮৬ হাজার টাকায়। অন্য ব্র্যান্ডের আরও চারটি কার্ড রিডার নেওয়া হয়েছে ১১ হাজার ১৮০ টাকায়। ২০ সেট রিচার্জেবল ব্যাটারি কেনা হয়েছে ৬৮ হাজার ৮০০ টাকায়। ছয়টি রিচার্জেবল ব্যাটারি কেনা হয়েছে ৮৩ হাজার ৮৫০ টাকায়। প্রতিটির দাম নেওয়া হয়েছে ১৩ হাজার ৯৭৫ টাকা। সংশ্লিষ্টদের মতে এসবের বাজারমূল্য ৯০০ থেকে ১২০০ টাকা। টেন্ডারে এগুলো জাপানিজ কোম্পানি নিক্কনের দেওয়ার কথা। কিন্তু সরবরাহ করা হয়েছে সিমপেক্স কোম্পানির।

সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্টরা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ক্যামেরার যেসব আইটেম দেওয়া হয়েছে তার বেশির ভাগই নিম্নমানের। কোনোটির লোগো লাগানো হয়েছে, কোনোটির পার্টস অন্য কোম্পানির দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রতিটির ক্ষেত্রে ব্র্যান্ডের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিছু আইটেম দেখে মনে হয়েছে এগুলো রাজধানীর স্টেডিয়াম মার্কেট থেকে কিনে দেওয়া হয়েছে। সুষ্ঠু তদন্ত হলে হরিলুটের ভয়াবহ চিত্র উঠে আসবে।

ক্যামেরার এসব আইটেম সরবরাহ করেছে সেফ ট্রেডার্স নামে একটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। এর প্রোপ্রাইটর হিসেবে নাম রয়েছে সঞ্জয় কুমার দাসের। ঠিকানা আলহাজ শামসুদ্দিন ম্যানসন (সিক্স ফ্লোর), ১৭ নিউ ইস্কাটন রোড, মগবাজার। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব কোনো ওয়েবসাইট খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে তাদের একটি ফেসবুক পেজ রয়েছে। সেখানে থাকা নম্বরে যোগাযোগ করা হলে জেনারেল ম্যানেজার পরিচয়দানকারী মিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘দামি ব্র্যান্ডের মালামাল দেওয়ায় দাম বেশি পড়েছে। পাশাপাশি ভ্যাট, ট্যাক্স রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘সরকারি কেনাকাটায় এ ধরনের দাম অস্বাভাবিক নয়। বাংলাদেশে হামেশা এটা হয়ে থাকে।’ বাজারমূল্যের সঙ্গে দামের পার্থক্য ও অন্য ব্র্যান্ডের আইটেম দেওয়া হয়েছে-এটা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে ফোনের লাইন কেটে দেন। বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে কার্যাদেশে স্বাক্ষরকারী সংসদ সচিবালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. মহিদুল হক বলেন, ‘কেনাকাটা নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়। তাদের মতামতের ভিত্তিতে এসব হয়েছে। আমি সংসদ সচিবালয়ে নতুন এসেছি। পদাধিকারের কারণে স্বাক্ষর করতে হয়েছে। তবে এসব প্রক্রিয়া আমি যোগদানের আগেই হয়েছে।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংসদ সচিবালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, আগের সচিব নিজে এ কেনাকাটা তত্ত্বাবধান করেছেন। কোম্পানি নির্ধারণ করেছেনও তিনি। তবে সবকিছু নিয়মের বেড়াজালে থেকে করেছেন। ভবিষ্যতে যেন তিনি না ফাঁসেন সেসব ব্যবস্থা করে তিনি তড়িঘড়ি এসব করেছেন। সংসদ সচিবালয়ে ২০ বছরের বেশি চাকরি করছেন এমন এক ফটোগ্রাফারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বলেন, ‘সর্বনিম্ন ৪ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকার ক্যামেরা সেট হলেই অধিবেশন কক্ষের ছবি ভালোভাবে তোলা সম্ভব। অতীতে তা-ই হয়েছে। ৫৮ লাখ টাকার ক্যামেরা সেট কেনা একেবারে অস্বাভাবিক। আমার চাকরি জীবনে এ ধরনের কেনাকাটা দেখিনি, শুনিওনি।’ সংসদ সচিবালয়ের বাইরে ফটোগ্রাফির কাজ করেন এমন আরও দুজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় বাংলাদেশ প্রতিদিনের পক্ষ থেকে। তাঁরা জানান, সংসদ অধিবেশনকক্ষ একটি ছোট জায়গার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এখানকার ছবি তোলার জন্য যেসব ক্যামেরা বডি, লেন্স, মেমোরি কার্ড ও চার্জারের কথা বলা হয়েছে তাতে আমরা রীতিমতো বিস্মিত ও হতবাক।’ এসব প্রসঙ্গে বক্তব্য জানতে সংসদ সচিবালয়ের সাবেক সচিব কানিজ মাওলাকে একাধিকবার ফোন করলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে টেক্সট পাঠানো হলেও তিনি উত্তর দেননি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
deneme bonusu veren siteler - canlı bahis siteleri - casino siteleri casino siteleri deneme bonusu veren siteler canlı casino siteleri error code: 520
deneme bonusu veren siteler - canlı bahis siteleri - casino siteleri casino siteleri deneme bonusu veren siteler canlı casino siteleri error code: 520