প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ১০০ দিন

Reporter Name / ২ Time View
Update : শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬

বাংলাদেশের সাড়ে তিন মাস বয়সি সরকারের কার্যকাল দেখে সামনে পড়ে থাকা অবশিষ্ট চার বছর সাড়ে আট মাস মেয়াদে তারা কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারে, তা সম্পূর্ণ মূল্যায়নের জন্য অত্যন্ত অল্প সময়। শেখ হাসিনার অধীনে কার্যত ব্যক্তিনির্ভর বাংলাদেশে নতুন একটি সরকার যত বিপুল ভোটেই নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করুক না কেন, তাদের যদি মেয়াদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দলীয়, প্রশাসনিক ও বিরোধীদলীয় চাপের মধ্যে কাটাতে হয়, তাহলেও বিস্মিত হওয়ার কিছু থাকবে না। অতএব তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার গত ফেব্রুয়ারি মাসে রাষ্ট্রক্ষমতার দায়িত্ব নিয়ে যে সামান্য সময় কাটিয়েছে, এর মধ্যে সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতা মূল্যায়নের চেষ্টা অযৌক্তিক। তবে ক্ষমতায় যাওয়ামাত্র সরকার কী করবে, তার বড় ধরনের পূর্বাভাস দেওয়ার উদ্দেশ্যে জনগণের মস্তিষ্কে চাপ সৃষ্টির কাজটি প্রায় প্রতিটি দেশে প্রতিটি নতুন সরকারই করে। চমক দেখাতে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করেই ‘১০০ দিনের কর্মসূচি’ ঘোষণা করেন, বাংলাদেশে অতীতে শেখ হাসিনা তা করেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও অনেকটা প্রথামত ‘১০০ দিনের কর্মসূচি’ ঘোষণা করে তা শেষও করেছেন।

বাংলাদেশের মতো ক্ষুদ্র আয়তনের স্বল্পোন্নত দেশের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ১০০ দিনে মহাশক্তিধর আমেরিকার প্রেসিডেন্টের মতো চমক দেখানো সম্ভব নয় এবং তারেক রহমানও তা দেখাননি। তবে এ সময়ে তিনি বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কিছু কিছু কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছেন- ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ইমাম-মুয়াজ্জিন ও পুরোহিতদের মাসিক ভাতা, প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্কুল ড্রেস বিতরণসহ আর্থিক প্রণোদনা, স্নাতক পর্যায়ে মেয়েদের বিনা বেতনে অধ্যয়নের সুযোগ, খাল খননসহ বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছেন। কিন্তু এসব কি উল্লেখ করার মতো কোনো সাফল্য বা গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সূচনা? এ কথা বললে বোধ হয় দোষণীয় হবে না যে সরকারপ্রধান হিসেবে তারেক রহমান তাঁর ‘প্রথম ১০০ দিনে’ উল্লেখ করার মতো কিছু দেখাতে পারেননি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অবস্থা শোচনীয়, ব্যাংকিং খাতে সৃষ্ট চরম বিশৃঙ্খলা কাটিয়ে ওঠার কোনো বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ না করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। শিশুহত্যা ও শিশু-ধর্ষণের ঘটনা ভয়াবহ বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশে উচ্চফলনশীল ফসলের উৎপাদনের মতো কয়েক গুণ বেড়েছে চাঁদাবাজি। বিশেষ করে ভোগ্যপণ্য পরিবহনকারী ট্রাক এবং বাজারে বেপরোয়া চাঁদাবাজির কারণে খাদ্যসামগ্রীর মূল্য বেড়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। এ পরিস্থিতিতে জনগণের মধ্যে এত ক্ষোভ বিরাজ করছে, এটিকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে ঘাপটি মেরে থাকা কিছু খোলস থেকে কচ্ছপ মাথা বের করার মতো গলা বাড়িয়ে এমনও বলার চেষ্টা করছে, ‘আওয়ামী আমলেই ভালো ছিলাম।’

তারেক রহমান দীর্ঘ সতেরো বছর পর দেশের মাটিতে পা রেখে তাঁর স্বপ্নের কথা বলেছিলেন, জনগণ আশায় ছিল, তিনি তাঁর স্বপ্ন তুলে ধরবেন প্রথম ১০০ দিনে। তারা আশাহত হয়েছে তাদের নেতার স্বপ্নের ব্যাখ্যা না পেয়ে।

কথিত ‘প্রথম ১০০ দিন’ অনুকরণের মাঝে যদি চমক দেখানোর মতো কিছু না থাকে, তাহলে অর্থহীনভাবে অন্য কারও দেখাদেখি তা অনুকরণ করা কোনোভাবে সংগত হতে পারে না। আমাদের সরকারগুলো যেখান থেকে এসব অনুকরণ করতে শেখে, সেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম ১০০ দিনে ১৪৩টি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন, যা এই সময়সীমার মধ্যে অতীতের যেকোনো প্রেসিডেন্টের জারি করা নির্বাহী আদেশসংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি। রাষ্ট্র পরিচালনাট্রাম্পের এসব আদেশের কোনো কোনোটি ছিল দুনিয়াকাঁপানো আদেশ, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানিকারক বিশ্বের প্রায় সব দেশের রপ্তানিপণ্যের ওপর বর্ধিত শুল্কহার আরোপ; অভিবাসননীতি সংস্কার এবং অবৈধ অভিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে ঢালাওভাবে বহিষ্কার; বেশ কয়েকটি মুসলিম দেশসহ কয়েকটি দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা; বহু দেশের নাগরিকদের বিভিন্ন ক্যাটাগরির ভিসা প্রদানে কঠোর যাচাইবাছাই পদ্ধতি চালু; ফেডারেল ব্যয়সংকোচননীতির আওতায় একাধিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা ইত্যাদি। বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর তৃতীয় মেয়াদের প্রথম ১০০ দিনে অনেকগুলো বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প, কৃষি সংস্কারসহ গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় পরিকল্পনা অনুমোদন করেছেন, যার মধ্যে মহারাষ্ট্রে মেগা বন্দর স্থাপন প্রকল্প; বিশ্বের শীর্ষ ১০ বন্দরের একটি গভীর-ড্রাফট বন্দর প্রকল্প; ২৫ হাজার গ্রামকে শহরের সঙ্গে যুক্ত করতে ৬২ হাজার কিলোমিটার রাস্তা ও সেতু নির্মাণ প্রকল্প; আটটি নতুন রেললাইন স্থাপন, মেট্রো সম্প্রসারণসহ অসংখ্য প্রকল্প। বাংলাদেশ ছোট ও দুর্বল অর্থনীতির দেশ হোক, লক্ষ্য যদি সুদূরপ্রসারী না হয়, তাহলে শুধু বিভিন্ন ধরনের কার্ড ইস্যু করার মধ্য দিয়ে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণের চেষ্টা জাতীয় উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে না।

বিশ্বজুড়ে প্রায় সব দেশে সরকার ও রাজনীতিবিদদের ওপর থেকে জনগণের বিশ্বাস ও আস্থা কমে গেছে। একধরনের ঘৃণাও জন্মেছে। এজন্য রাজনীতিবিদরাই দায়ী। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁরা জনগণকে যে প্রতিশ্রুতি দেন, নির্বাচিত হয়ে তা ভুলে যান। তাঁরা সরকারি দায়িত্ব পেয়ে অবাধে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠন করেন, নিজেদের ব্যবসাবাণিজ্যের ডালপালা সম্প্রসারণ করেন এবং যত্রতত্র তাঁদের পদের দাপট দেখিয়ে জনগণকে তটস্থ রাখেন। ২০০৯-২০২৪ মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকার তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় মাঠে সক্রিয় রাজনীতিবিদদের এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে রীতিমতো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিল। রাষ্ট্রীয় সম্পদ তো বটেই, আওয়ামী লীগ বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত সাধারণ নাগরিকদের জমিজমা, ব্যবসা, এমনকি ব্যাংকের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠান দখল করাকে তাদের অধিকারে পরিণত করেছিল। ২০২৪-এর আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তাদের অন্যায়গুলো জনগণের সামনে আসতে শুরু করে। আওয়ামী সুবিধাভোগীরা পালিয়ে বাঁচলেও দখল-লুণ্ঠনের যে ঐতিহ্য তারা রেখে গেছে, তার ওপর এখন যারা জাঁকিয়ে বসেছে সম্ভবত তারা নতুন সরকারেরই সুবিধাভোগী গোষ্ঠী। তাদের ওপর সরকারের প্রশ্রয় থাকলে আরও অনেকে একই ধরনের অবৈধ সুবিধা গ্রহণে উৎসাহিত হয়ে শেষ পর্যন্ত সরকারের গলার কাঁটায় পরিণত হবে। আওয়ামী লীগ সরকারের পরিণতিই বর্তমান সরকারের জন্য উত্তম শিক্ষা ও সতর্কতা।

বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, অতীতের রাজনৈতিক সরকারগুলোর জাতীয় স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ড যখনই সীমা ছাড়িয়ে গেছে, জনগণ তাদের ওপর ক্ষমতাসীন দলের গুন্ডা-মস্তানদের নির্যাতন, নিষ্পেষণ, শোষণে অতিষ্ঠ হয়ে সৃষ্টিকর্তা ছাড়া তাদের অসহায়ত্বের ফরিয়াদ আর কারও কাছে জানাতে পারেনি, তখন সংবিধানবহির্ভূত সরকারের আগমনকেও তারা অন্তত স্বাগত জানিয়েছে রাজনৈতিক দলনপীড়ন থেকে তাৎক্ষণিক স্বস্তি লাভ করায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারকে সতর্ক হয়ে পা ফেলতে হবে। ইতোমধ্যে জনগণ কোনো কোনো মন্ত্রীর অতিকথনে বিরক্ত। তাঁদের মুখের লাগাম টেনে না ধরলে তাঁরাই সরকারের প্রতি এখন পর্যন্ত বিদ্যমান ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও জন-আস্থায় ফাটল ধরাতে ভূমিকা পালন করবেন।

সাড়ে তিন মাস দীর্ঘ কোনো সময় নয়। তবু সবাই দেখতে চায়, সূচনাটা কীভাবে হলো। কোনো কিছুর শুরু প্রায়ই ইঙ্গিত দেয়, দিনের বাকি অংশ কীভাবে যাবে। সেদিক থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষিত ‘প্রথম ১০০ দিন’ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারত, যদি এ সময়ের মধ্যে তাঁর সরকারের পক্ষে প্রকৃত অর্থেই জাতীয় পর্যায়ে চমক সৃষ্টির মতো কোনো ঘোষণা দেওয়া সম্ভব হতো। দুঃখজনকভাবে তা হয়নি। একটি রাজনৈতিক সরকারের উদ্যোগ, আইনের শাসনের প্রতি নিষ্ঠা, জনগণের কাছে ভালো থাকা এবং অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সফলতা ব্যাপকভাবে নির্ভর করে প্রশাসনের নিরপেক্ষতার ওপর। বিএনপি সরকার ইতোমধ্যে দৃশ্যত প্রশাসনের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যা শুভ আলামত নয়। আওয়ামী লীগ সরকারকে বাংলাদেশে চিরস্থায়ী সরকার ভেবে আওয়ামী পৃষ্ঠপোষকতায় লালিত আমলারা প্রশাসনকে যেভাবে দুর্বল, দুর্নীতিগ্রস্ত বা আত্মস্বার্থকেন্দ্রিক দলদাসে পরিণত করেছিল, তার চড়ামূল্য দিতে হচ্ছে শেখ হাসিনাসহ তার দলের সর্বস্তরের নেতাদের। বিএনপির ক্ষেত্রে এর পুনরাবৃত্তি না ঘটুক।

সাবেক সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা তাঁর ওপর আস্থা না রাখা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মাঝে ছিলেন গুম-খুন-নিপীড়ন চালিয়ে ও মিথ্যা মামলায় বছরের পর বছর কারাগারে আটক রাখার ভীতি সৃষ্টি করে এবং আত্মবিরোধী প্রচারণায় নিজেকে সন্তুষ্ট রেখে। যেকোনো কর্তৃত্ববাদী শাসকের মতো শেখ হাসিনাও তাঁর ওপর জনগণের নিঃশর্ত আস্থা কামনা করতেন। তাঁর মরহুম পিতা শেখ মুজিবুর রহমানও তা চাইতেন। এই অগণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষা পিতা ও কন্যার ভাগ্যে নির্মম পরিণতি ডেকে এনেছে। অতএব ইতিহাসই বাংলাদেশের জনগণকে শিখিয়েছে, ক্ষমতাসীন কারও ওপর আস্থা স্থাপন করা উচিত নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত না তাঁরা তাঁদের ক্ষমতার সীমা ও মেয়াদের মধ্যে থেকে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জনকল্যাণমূলক কাজ করেন, ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করেন, দুর্নীতিপরায়ণদের বিচারের আওতায় আনেন, যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান করেন। বাংলাদেশের মতো ভঙ্গুর রাজনৈতিক কাঠামো, যেখানে বারবার কর্তৃত্ববাদী শাসন ফিরে আসে, তা প্রতিহত করার জন্য প্রয়োজন গণতান্ত্রিক রীতিনীতি মেনে আইনের শাসনের পথে জবাবদিহিমূলক সরকার নিশ্চিত করা। নতুন সরকারের কাছে এটাই জনগণের প্রত্যাশা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
deneme bonusu veren siteler - canlı bahis siteleri - casino siteleri casino siteleri deneme bonusu veren siteler canlı casino siteleri error code: 520
deneme bonusu veren siteler - canlı bahis siteleri - casino siteleri casino siteleri deneme bonusu veren siteler canlı casino siteleri error code: 520