অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা আর দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য দেশের প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) এবং জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (ডিআরআরও) অফিসগুলো। বিভিন্ন প্রকল্প কাজে কমিশন বাণিজ্য, কাজ না করে বিল দেখানো, নামসর্বস্ব মসজিদ, মাদ্রাসা, মাজার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পের নামে বরাদ্দ দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করার সূতিকাগার এসব অফিস। সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা খাত যেন এই জেলা উপজেলার কর্মকর্তাদের কাছেই জিম্মি। জানা যায়, পিআইও-ডিআরআরও সরাসরি হস্তক্ষেপে এসব অফিসে দুর্নীতি হয়ে থাকে। ফলে জেলা উপজেলার জনগণ সরকারের প্রকৃত উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সরকারের অভ্যন্তরীণ অডিটে এসব দুর্নীতি ও অনিয়মের চিত্র উঠে এলে একটু নড়ে চড়েই বসেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়।
জানা যায়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলা আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির একটি বিস্তৃত চিত্র উঠে এসেছে সাম্প্রতিক অভ্যন্তরীণ অডিটেও। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (ডিআরআরও) এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাদের (পিআইও) বিরুদ্ধে অব্যয়িত সরকারি অর্থ কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে প্রায় ১৫ কোটি টাকার অনিয়ম শনাক্ত করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ডিপার্টমেন্টাল প্রসেস (ডিপি), বিভাগীয় মামলা রুজু করা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) দিয়ে অধিকতর তদন্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রণালয়। সরকারি বিধি অনুযায়ী কোনো প্রকল্পের বরাদ্দকৃত অর্থ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যয় না হলে তা ৩০ জুনের পর সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বাস্তবে অনেক ডিআরআরও, পিআইও এ নিয়ম মানছেন না। অনিয়ম করে বছরের পর বছর অব্যয়িত অর্থ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে দিচ্ছেন। এসব অর্থের মধ্যে রয়েছে সাধারণ রিলিফ (জিআর), টেস্ট রিলিফ (টিআর), কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা), কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) এবং হতদরিদ্রদের গৃহ নির্মাণ প্রকল্পের বরাদ্দ। এর ফলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা খাতে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও আর্থিক বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে।
অডিট প্রতিবেদনে দেখা যায়, মন্ত্রণালয়ে বর্তমানে তিন হাজার ২৪টি অডিট আপত্তি জমা রয়েছে, যার মধ্যে ৯৩০টি অত্যন্ত গুরুতর। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সারা দেশে ৩০০ থেকে ৪০০ জন পিআইও এবং ডিআরআরও এ অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। ইতোমধ্যে ২৯ কর্মকর্তাকে শোকজ করা হয়েছে। বাকিদের ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিতে কঠোর অবস্থানে মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব সাইদুর রহমান খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দুর্নীতি অনিয়মের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয় কঠোর। যারা অব্যয়িত টাকা জমা না দিয়ে নিজের কাছে রেখে দেয় এমন ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে শোকজ করা হয়েছে। কয়েকজনের নামে বিভাগীয় মামলা হবে। আর বড় বিষয়গুলো দুদকে পাঠিয়ে দেব। অনিয়ম নিয়ে কোনো ছাড় নয়। আগের সরকারের সময় যা হয়েছে এখন সেসব হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এ ছাড়া সরকারি নীতিমালায় একই কর্মস্থলে তিন বছর থাকার কথা থাকলেও কেউ কেউ ৫ থেকে ৭ বছর ধরেই একই কর্মস্থলে আছেন। আবার কেউ মামলা করেও থাকছেন একই স্টেশনে। দেশের ১১টি উপজেলায় কর্মরত পিআইও বদলির কারণে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছেন। মামলা করা ওই পিআইওরা পাঁচ বছর বা আরও বেশি সময় ধরে একই স্টেশনে আছেন। এ বিষয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব সাইদুর রহমান খান বলেন, আমরা তালিকা করছি কারা তিন বছরের বেশি সময় ধরে এক স্টেশনে আছেন। নতুন নীতিমালার কারণে পিআইওদের যখন তখন বদলি করা যাবে। ফলে তাদেরও ভয় আছে। পিডিদের নিয়েও কাজ করছি। যাদের অনিয়ম বিষয়ে জেনেছি। ব্যবস্থা হচ্ছে এবং আরও হবে। জানা গেছে, দেশের প্রায় অধিকাংশ পিআইও-ডিআরআরওর নামে নানা অভিযোগ দুর্যোগ অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে আসলেও অদৃশ্য কারণে এসব অভিযোগ ফাইলেই চাপা পড়ে থাকে। অভিযুক্তদের যোগসাজশে কখনো ফাইল থেকে গায়েব হয়ে যায় অভিযোগপত্র। মন্ত্রণালয়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী এর সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। যাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখে পিআরওরা। এ কারণে মন্ত্রী-সচিবের দপ্তর পর্যন্ত তথ্য সঠিক সময়ে পৌঁছায় না।