বৈষম্য কমেনি বরং বৃদ্ধি পেয়েছে

Reporter Name / ৬ Time View
Update : শনিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২৬

স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও দেশে বৈষম্য জাতির অভ্যন্তরে স্থায়ী হয়ে রয়ে গেছে। চব্বিশের অভ্যুত্থানে বৈষম্যবিরোধী আওয়াজ উঠেছিল ঠিকই, কিন্তু বৈষম্য তো দূর হয়ইনি, বরং আরও প্রবলভাবে জাতির স্কন্দে চেপে বসেছে। বৈষম্য কেবল যে বাইরের ব্যাপার তা নয়, ভিতরের ব্যাপারও বৈকি; এবং সেটিই হচ্ছে অভ্যন্তরীণ মূল দুর্বলতা। পীড়িতরাও পীড়ন করে। কম করে না, তারা শোধ নেয়। ফলে পীড়ন ও পীড়া দুটিই সত্য হয়ে থাকে। দুর্বল জাতি মার খায় বড় জাতির হাতে। মার খেয়ে শোধ নেয় নিজের ঘরে। শোষণ ও অত্যাচার করে তুলনায় দুর্বল শ্রেণির ওপর।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এটা খুবই সত্য। ধনী এখানে পীড়ন করে গরিবকে। শোষণ করে। ফলে ঐক্য গড়ে ওঠে না। শ্রেণিবৈষম্যটাই মূল বৈষম্য। শ্রেণির ক্ষেত্রে সাম্যের প্রতি যে অভাব সেটা হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের পেছনেও কাজ করেছে। দূর অতীতে শ্রেণিগতভাবে মুসলমানরা ছিল দুর্বল ও পিছিয়ে পড়া। তদুপরি তাদের অধিকাংশই এসেছে সমাজের নিম্নস্তর থেকে, ধর্মান্তরিত হয়ে। ধর্মান্তরের আগে একাংশ অবশ্যই ছিল আদিবাসী। হিন্দু মধ্যবিত্তের ব্রাহ্মণ্যবাদী উন্নাসিকতা শ্রেণিগত উচ্চমন্যতার দ্বারা পুষ্ট হয়েছে। মূল অসাম্য নিশ্চয়ই অর্থনৈতিক। সেই অসাম্য থেকেই হিন্দু জাতীয়তাবাদ ও মুসলমান জাতীয়তাবাদ বের হয়ে এসেছে।

বৈষম্য ছিল পুরুষ ও নারীর সম্পর্কের এলাকাতেও। এখানেও শ্রেণি ছিল, উচ্চ শ্রেণিতে নারীর যে অবস্থান, নিম্ন শ্রেণিতে তা নয়। কিন্তু শ্রেণিনির্বিশেষে নারীর অবস্থা পুরুষের তুলনায় যে খারাপ ছিল, সে ব্যাপারে সংশয়ের কোনো প্রশ্নই নেই। বাঙালির সংস্কৃতিতে মাতৃত্বকে উচ্চমূল্য দেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে অর্থনীতির যে যোগ নেই, তা নয়। অর্থনীতি কৃষিনির্ভর, কৃষিতে উর্বরতা অত্যাবশ্যক, ফলনশীলতাই প্রধান গুণ। সেই মূর্তিতেই নারীর মাতৃত্ব সম্পর্কে উচ্চ ধারণা গড়ে উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রেই মাতার প্রতি ভালোবাসা নিজের প্রতি ভালোবাসারই প্রতিরূপ। মা আমার ব্যক্তিগত সম্পত্তি, তাই তিনি মূল্যবান, মনোভাবটি এরকমই। মাতৃভূমির জয়গান কম করা হয়নি, হচ্ছেও না। কিন্তু তাতে ব্যক্তি মাতার তেমন কোনো লাভ হয়নি, মাতৃভূমিরও যে উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটেছে, তা নয়। মাতার নামে ঐক্যের ডাকে জাতীয় ঐক্য না এসে বরঞ্চ বিভেদ এসেছে।

বিভেদের ক্ষেত্রে আঞ্চলিকতাও ইন্ধন সরবরাহ করেছে। পূর্ববঙ্গ কম অনুন্নত পশ্চিম ও উত্তরবঙ্গের তুলনায়। জলাভূমি দিয়েই পূর্ববঙ্গ মূলত গঠিত। ইংরেজ আমলে বাংলার রাজধানী ছিল কলকাতা। উন্নয়নের স্রোত ওই শহরমুখীই ছুটেছে, সবেগে। অনুন্নত পূর্ববঙ্গ আরও অনুন্নত হয়েছে। এখানকার অধিবাসীরা বাঙালি নয়, বাঙ্গাল বলে চিহ্নিত হয়ে এসেছে। অনুন্নত পূর্ববঙ্গে মুসলমানের সংখ্যাধিক্য; আঞ্চলিক বৈষম্য বৃদ্ধির ব্যাপারে এই সত্যটাও একটা উপাদান হিসেবে কার্যকর ছিল।

রাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রের উত্থান ও পতন ঘটেছে। কিন্তু তাতে বৈষম্য দূর হয়নি। বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূল দুর্বলতা ও প্রধান শত্রু দুটোই হচ্ছে বৈষম্য। রাষ্ট্রের উত্থানপতন সেই শত্রুকে স্পষ্টরূপে চিহ্নিত হতে দেয়নি; বরং তাকে অস্পষ্ট করে দিয়েছে। বিশেষ করে শ্রেণিবৈষম্যকে। ইংরেজ শাসনে ভারতবর্ষে একটি রাষ্ট্রীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সেটা ভিতর থেকে গড়ে ওঠেনি, ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভারতবর্ষে জাতি একটি ছিল না, দুটিও নয়, ছিল অনেক কটি। সেই জাতিসত্তাগুলো স্বীকৃতি পায়নি। ভারতবর্ষ একটি দেশ নয়, উপমহাদেশ। রাশিয়াকে বাদ দিলে ইউরোপের যা আয়তন, ভারতবর্ষের আয়তন তার সমান। সেই বৃহৎ দেশে বিভিন্ন ভাষাভাষী জাতির বাস। এদের মধ্যে অর্থনৈতিক বিকাশের সমতা আসেনি। ওই অসাম্যের দরুন ভারত-পাকিস্তান ভাগাভাগি হয়েছে এবং পাকিস্তানও এক থাকতে পারেনি। এখন ভারতেও জাতিগত সমস্যার টানাপোড়েন ও সংঘর্ষ প্রত্যক্ষ হয়ে উঠেছে। টিকে থাকতে পারবে কি না, সন্দেহ। খণ্ডিত পাকিস্তান সম্পর্কেও সেটা সত্য। ব্যাপার অন্যরকম হতো, যদি অর্থনৈতিক বিকাশের ক্ষেত্রে বিভিন্ন জাতিসত্তার ভিতর সমতা থাকত এবং অবিভক্ত ভারতে একটি সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতো। যেখানে জাতিসত্তাগুলো যোগ দিত স্বেচ্ছায় এবং প্রত্যেকেরই স্বাধীনতা থাকত ইচ্ছা করলে বিচ্ছিন্ন হওয়ার। সেটা ঘটতে দেওয়া হয়নি বলেই এত সব বিপর্যয় ও এমন অব্যাহত দুর্যোগ। ব্রিটিশের রাষ্ট্র বৈষম্য দূর করেনি, বাড়িয়েছে। পরবর্তী রাষ্ট্র দুটিরও ওই একই কাজ। বাংলাদেশে বাংলা রাষ্ট্রভাষা হয়েছে। কিন্তু আবার হয়ওনি। মধ্যবিত্ত প্রায়-উন্মত্ত ইংরেজি শিখতে। কোম্পানির শাসনামলে যা দেখা যেত, আজও তাই দেখা যাচ্ছে।

সর্বত্র ইংরেজি শিখবার উন্মাদনা। পশ্চিমবঙ্গে প্রাথমিক স্তর থেকেই ইংরেজি শিক্ষার অধিকারের দাবিতে প্রবল আন্দোলন হয়েছে। সেখানে যুক্তি হচ্ছে ইংরেজি কম জানার দরুন পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষার্থীরা সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না, পিছিয়ে পড়ছে। তদুপরি হিন্দি সাম্রাজ্যবাদ প্রতিহত করার অজুহাতটাও রয়েছে। বাংলাদেশে অবশ্য শুরুর স্তর থেকেই ইংরেজি পড়ানো হয়। ইংরেজি শিক্ষার ব্যাপারে এখানেও সেই একই আগ্রহ। এখানকার প্রতিযোগিতাটা অভ্যন্তরীণ। পার্থক্য ওইটুকুই, নইলে ঘটনা একই। কৌতুককর ব্যাপার এই যে ব্রিটিশ শাসনামলে ইংরেজি ভাষার যে আধিপত্য ছিল, সেটা আবার ফেরত আসছে। জাতীয় স্বাধীনতা এসেছে কি আসেনি এই ঘটনা তার একটি দ্যোতক বটে। যেমন ভারতে, তেমনি বাংলাদেশে।

আমাদের সমষ্টিগত মানুষের মুক্তি আসেনি কেন? মুক্তি আসেনি এই কারণে যে ওই যে পুঁজিবাদী ধারা-যেটা ব্রিটিশ আমলে ছিল, পাকিস্তান আমলে ছিল, আজও আছে, সেই পুঁজিবাদী উন্নয়নের ধারাই অক্ষুণ্ন রয়েছে। আমরা ব্রিটিশ আমলে তিন ধারার শিক্ষা দেখেছিলাম। পাকিস্তান আমলে সেটা আরও বড় হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশে তিন ধারার শিক্ষা থাকবে না, সব শিক্ষা মাতৃভাষার মাধ্যমে হবে, মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা গভীর হবে, স্থায়ীভাবে এবং প্রকৃত শিক্ষা হবে-এইটা ছিল আমাদের স্বপ্ন, এটা ছিল আমাদের চ্যালেঞ্জ। কিন্তু কোথায় সেই স্বপ্ন, কোথায় সেই চ্যালেঞ্জ? এখন তো তিন ধারার শিক্ষা কেবল যে আছে তা নয়, এই শিক্ষা আরও বিস্তৃত, আরও গভীর হয়েছে। তার কারণ শ্রেণিবিভাজন আরও বড় হয়েছে। শ্রেণিবিভাজন আরও গভীরে চলে যাচ্ছে। কাজেই তিন ধারাকে এক ধারায় আনা, সেটা একেবারেই অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই যে আমাদের বাংলাদেশ, এর এত যে সম্পদ; এই সম্পদের জন্যই যুগে যুগে, শতাব্দীতে বিদেশিরা এখানে এসেছে। বাংলাদেশের নগর-বন্দর তারা ব্যবহার করেছে, আমাদের পণ্য আমরা রপ্তানি করেছি। এই বাংলাদেশ এত দরিদ্র হলো কেন? দরিদ্র হলো এই কারণে যে এখানে উপনিবেশ স্থাপিত হয়েছিল। এখানকার সম্পদ একসময় দিল্লিতে যেত, পরে এই সম্পদ লন্ডনে চলে যাওয়া শুরু করল। পাকিস্তান আমলে দেখলাম সম্পদ করাচিতে চলে যাচ্ছে। এসবই ছিল একটি ঔপনিবেশিক শোষণ প্রক্রিয়া, যেখানে বাংলাদেশ হচ্ছে একটা উপনিবেশ। পাকিস্তানিরা যে অভ্যন্তরীণ একটা উপনিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করছিল, ওই ঔপনিবেশিকতা থেকে মুক্ত হয়নি আজকের বাংলাদেশও।

তাকালেই দেখা যাবে এই বাংলাদেশ এখন ধনীদের, বিত্তবানদের উপনিবেশে পরিণত হয়েছে। ঔপনিবেশিকরা যেমন এখান থেকে লুণ্ঠন করত, শোষণ করত এবং সেই সম্পদ পাচার করত, আজকের বাংলাদেশের সেই একই ঘটনা ঘটছে। ধনীরা এখানকার সম্পদ লুণ্ঠন করছে এবং শ্রমিকের ঘামের বিনিময়ে যে অর্জিত সম্পদ, তা বিদেশে চলে যাচ্ছে। অর্থাৎ ওই ঔপনিবেশিকতা আছে, ওই পুঁজিবাদী উন্নয়ন আছে; সেখান থেকে আমরা মুক্তি পাইনি। আমাদের একাত্তরে স্বপ্ন ছিল এই যে আমরা মুক্ত হব, আমরা তার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছি। কিন্তু মুক্তি এলো না। আগের ব্যবস্থাই রয়ে গেল। আগের রাষ্ট্রই রয়ে গেল, আগের আইন, আগের কানুন, আগের বাহিনী, আগের শিক্ষাব্যবস্থা, সবকিছু রয়ে গেল। কেন রয়ে গেল? রয়ে গেল এই কারণে যে শাসনক্ষমতা পুঁজিবাদীদের হাতে চলে গেল। ব্রিটিশের পুঁজিবাদী শোষণ-শাসন আগেই ছিল, পাকিস্তানি পুঁজিবাদ সেখানে এলো। স্বাধীন বাংলাদেশে তার জায়গায় এলো বাঙালি পুঁজিবাদ, বাঙালি বুর্জোয়া। সেজন্য যে জিনিসটা আমাদের জানতে হবে, সেটা হলো ব্যক্তিগত উন্নয়নে চলবে না। কেবল শুধু গাড়িঘোড়ার স্বপ্ন দেখা, চড়ার স্বপ্ন দেখে শিক্ষা গ্রহণ করা না। আমাদের এই সমাজকে বদলাতে হবে।

এই সমস্যা কেবল আমাদের নয়, আজ সারা পৃথিবীর সমস্যা হচ্ছে সম্পত্তির ব্যক্তিমালিকানার সমস্যা এবং ব্যক্তিমালিকানার বিপরীত যে ধারা, সেটা হচ্ছে সামাজিক মালিকানা। হ্যাঁ, সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়েছিল। বিপ্লব হয়েছিল ১৯১৭ সালে রাশিয়াতে, বিপ্লব হয়েছে চীনে, বিপ্লব হয়েছে অন্য দেশে, পূর্ব ইউরোপে, কিউবায়। কিন্তু ওই যে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা, সেটা সেখানে টিকল না। টিকল না কেন? টিকল না ভিতরে ও বাইরের পুঁজিবাদী মতাদর্শীদের চাপে পড়ে।

আজকের দিনে পৃথিবী থাকবে কি থাকবে না, তা মনুষ্য উপযোগী হবে কি হবে না, সেটা নির্ভর করছে মালিকানা কাদের কাছে থাকবে তার ওপরই।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
deneme bonusu veren siteler - canlı bahis siteleri - casino siteleri casino siteleri deneme bonusu veren siteler canlı casino siteleri error code: 520
deneme bonusu veren siteler - canlı bahis siteleri - casino siteleri casino siteleri deneme bonusu veren siteler canlı casino siteleri error code: 520