সরকারের ওপর জ্বালানি ভর্তুকির বিশাল বোঝা

Reporter Name / ৫ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কয়েক মাস ধরেই জ্বালানি আমদানিতে ক্ষতির মধ্যে আছে সরকার। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র জানান, চলতি বছরে জ্বালানি তেলের জন্য ভর্তুকি চেয়ে এরই মধ্যে সরকারের জ্বালানি বিভাগের কাছে পাঁচবার চিঠি পাঠানো হয়েছে। সে চিঠিতে জুনের ২৩ তারিখ পর্যন্ত চার মাসে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকিও চাওয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও বিপিসির সঙ্গে বৈঠকও করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সরকার যখন বিশাল পরিমাণ এই ভর্তুকির চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে নতুন করে বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নতুন করে এ বাড়তি মূল্যের চাপ সামাল দিতে সরকার যদি ভর্তুকি না দেয়, তখন দেশের বাজারে আবারও জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পাবে। আর এমন হলে মূল্যস্ফীতিও বাড়বে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে গতকাল বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্য আবারও বৃদ্ধি পেয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য ২ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ছাড়িয়েছে ৯০ ডলারের বেশি। সেপ্টেম্বরে সরবরাহকৃত তেলের মূল্য চুক্তি অনুসারে ২ দশমিক শূন্য ৯ ডলার বা ২ দশমিক ৩৭ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯০ দশমিক ১৯ ডলারে। এর আগে যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে ৩০ এপ্রিল তেলের মূল্য ব্যারেলপ্রতি সর্বোচ্চ ১২৬ ডলারে ওঠে। সে সময় তেল জোগাড় করতে তেল আমদানীকারক দেশগুলোকে হিমশিম খেতে হয়।

সরকারের আমদানীকৃত তেলের মধ্যে ৭০ শতাংশই ডিজেল। আর সরবরাহকৃত জ্বালানির মধ্যে অকটেন ও পেট্রোলের পরিমাণ কম হওয়ায় সামান্য ক্ষতি হলেও তা পুষিয়ে নেওয়া যায়। ফলে ডিজেলের দামের ওপরও সবকিছু নির্ভর করে। বিপিসি সূত্র বলছেন, জ্বালানি বিভাগ গত এক মাসের মধ্যে তেলের জোগান বৃদ্ধি করেছে। এতে বর্তমানে দেশে দুই মাসের জ্বালানির জোগান আছে। বিপিসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ডিজেলের মূল্য আগে ছিল ১১৪ টাকা। অন্তর্বর্তী সরকার এবং নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কিছু প্রণোদনা দিয়ে তা কমিয়ে ১০০ টাকায় নিয়ে আসা হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের সময় এ মূল্য বৃদ্ধি করে ১১৫ টাকায় নিয়ে আসা হয়। সে ক্ষেত্রে মূল্য ১ টাকা বাড়ানো হয়। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে ডিজেলে প্রতি লিটারে ৩০ থেকে ৪০ টাকা করে ক্ষতি হতো। বিপিসিকে সে সময় সরকার কোনো ভর্তুকি দেয়নি। এরই মধ্যে সরকারের জ্বালানি বিভাগের কাছে ভর্তুকি চেয়ে বিপিসি কর্তৃপক্ষ পাঁচ দফায় চিঠি দিয়েছে। এর মধ্যে চতুর্থ দফার চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে জ্বালানি বিভাগ অর্থ মন্ত্রণালয় বরাবর সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির কথা উল্লেখ করে। মূলত মার্চ, এপ্রিল, মে-এ তিন মাসে বিপিসির যে পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়, তার কথা উল্লেখ করে জ্বালানি বিভাগকে চিঠি লেখা হয়েছিল। সম্প্রতি জ্বালানি বিভাগ বরাবর আরও একটি চিঠি পাঠানো হয়। সে চিঠিতে জুনের ২৩ তারিখ পর্যন্ত চার মাসে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি চাওয়া হয়। সর্বশেষ ২ জুলাই তিন মাসে সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়ে জ্বালানি বিভাগ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। আর পঞ্চম চিঠিটি বোর্ডের সুপারিশসহ জ্বালানি বিভাগে পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে জ্বালানি বিভাগ ব্যবস্থা নেবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিপিসির বিভিন্ন প্রকল্প যেমন ইস্টার্ন রিফাইনারি ইউনিট-২ বাস্তবায়ন, ঢাকা-চট্টগ্রাম এসপিএম এবং জেট অয়েল পাইপলাইন নির্মাণের জন্য যে অর্থ রাখা আছে সেখান থেকে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা তুলে জ্বালানি তেলের সরবরাহ এখন স্বাভাবিক রাখা হয়েছে। আশা করা হয়েছিল যুদ্ধ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে হয়তো পরিস্থিতি কিছুটা ভালো হবে। কিন্তু বাস্তবে তেমন হয়নি। জানা গেছে, বিপিসির ক্ষতির বিষয়টি সম্পর্কে আইএমএফও অবগত আছে। বিষয়গুলো নিয়ে আইএমএফ কর্তৃপক্ষও কথা বলছে।

বিপিসির পরিচালক (অর্থ) ও যুগ্মসচিব নাজনীন পারভীন গতকাল বলেন, ‘তেলের মূল্য বৃদ্ধি বা কমানোর বিষয়টি আমাদের হাতে নেই। আমরা এ ব্যাপারে চলতি বাজার অনুযায়ী যেমন মূল্য হওয়া উচিত সে ব্যাপারে সুপারিশ পাঠাই। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় জ্বালানি বিভাগ জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি বা হ্রাসের বিষয়টি ঘোষণা করে। এ ধরনের সুপারিশ আমরা প্রতি মাসেই দিয়ে থাকি। এখন বিশ্ববাজারে তেলের যে মূল্য তা স্বাভাবিক নয়। এ ক্ষেত্রে ভর্তুকি দিলেও সরকারের পক্ষে বাড়তি মূল্যের বোঝা সামাল দেওয়া কষ্টকর হয়ে যাবে। যুদ্ধের কারণে আমরা সবাই কষ্টে আছি। বাজারে প্রতি লিটার ডিজেলের মূল্য ১১৫ টাকা এ পর্যন্ত দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।’

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধি পেলে স্বাভাবিকভাবেই পরিবহন খাতে মূল্য বৃদ্ধি পাবে। আর পণ্য বহনকারী সব খাতেই এর প্রভাব পড়বে। এমন হলে তা মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। পরিবহনে ভাড়া বৃদ্ধির অসিলায় পণ্যের মূল্য অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বৃদ্ধি পায়। আর এ পরিস্থিতি সামলানোর জন্য সরকারের কোনো ব্যবস্থা নেই। হিসাব করে জ্বালানি তেলের মূল্য কী পরিমাণ বৃদ্ধি হবে তা বের করা যায়; কিন্তু এটি বের করে সরকার যে তা বাস্তবায়ন করবে সে রকম কোনো ম্যাকানিজম নেই। তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সরকারকে যদি আবার ভর্তুকি দিতে হয় তাহলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।’

জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় ২ বিলিয়ন ডলার : বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জ্বালানি আমদানিতে প্রায় ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। গতকাল চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় তিনি এ কথা বলেন। মন্ত্রী বলেন, ‘বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ বেড়েছে। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।’


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
deneme bonusu veren siteler - canlı bahis siteleri - casino siteleri casino siteleri deneme bonusu veren siteler canlı casino siteleri error code: 520
deneme bonusu veren siteler - canlı bahis siteleri - casino siteleri casino siteleri deneme bonusu veren siteler canlı casino siteleri error code: 520