৫৬টি দেশের সমন্বয়ে গঠিত কমনওয়েলথ জোটের প্রশাসনিক ক্ষমতার ভারসাম্যে এক নীরব অথচ তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে। এই প্রভাবশালী ব্লকের নির্বাহী কমিটিতে সর্বসম্মতিক্রমে নির্বাচিত হয়েছে বাংলাদেশ। লন্ডনের মার্লবরো হাউসে কমনওয়েলথ সেক্রেটারিয়েটের সদর দফতরে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ বোর্ড অব গভর্নরস-এর সভায় এই যুগান্তকারী সাফল্য আসে। সেখানে অন্তর্বর্তীকালীন কূটনৈতিক তৎপরতায় ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের জন্য অত্যন্ত প্রভাবশালী এক্সিকিউটিভ কমিটিতে (এক্সকো) বাংলাদেশের আসন নিশ্চিত হয়।
বোর্ড সভায় বাংলাদেশের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করেন যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার ড. নজরুল ইসলাম। পর্দার আড়ালের সফল কূটনৈতিক আলোচনার মধ্য দিয়েই এই সর্বসম্মত ভোট নিশ্চিত হয়েছে বলে লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাই কমিশন জানিয়েছে।
দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সন্ধিক্ষণে এই কৌশলগত সাফল্য এলো। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এবং পরবর্তীতে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের পর থেকে আন্তর্জাতিক মহল ঢাকার প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রার দিকে গভীরভাবে নজর রাখছিল। সফলভাবে ও নিবিড় পর্যবেক্ষণে অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের জাতীয় নির্বাচনের পরপরই লন্ডনের এই কূটনৈতিক বিজয় বর্তমান প্রশাসনের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্পষ্ট সমর্থনেরই বহিঃপ্রকাশ।
অভ্যন্তরীণ সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাওয়ার এই সময়ে বৈশ্বিক বিচ্ছিন্নতা বা কাঠামোগত দ্বিধাদ্বন্দ্বের মুখোমুখি হওয়া তো দূরের কথা, বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্ব স্বাধীনতার পর তাদের প্রথম আন্তর্জাতিক সংস্থায় নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে সক্ষম হলো।
কমনওয়েলথ এক্সিকিউটিভ কমিটি কেবল কোনও প্রতীকী পরিষদ নয়; এটি মূলত এই জোটের অভ্যন্তরীণ যাবতীয় কার্যক্রমের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। ১৬টি সদস্য দেশের সমন্বয়ে গঠিত এই কমিটির প্রশাসনিক কাঠামোটি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বিভক্ত। এর মধ্যে আটটি আসন এই ব্লকের সর্বোচ্চ আর্থিক অবদানকারী দেশগুলোর জন্য স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত থাকে, আর বাকি আটটি আসন ভৌগোলিক অঞ্চলের ভিত্তিতে প্রতিদ্বন্দিতার মাধ্যমে নির্বাচিত হয়। বাংলাদেশ এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যান্ডেটটি অর্জন করেছে এশিয়া-ইউরোপ অঞ্চল থেকে সরাসরি নির্বাচিত হয়ে।
এই শীর্ষ কমিটিতে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে ঢাকা আন্তর্জাতিক নীতিমালার সঙ্গে কেবল খাপ খাইয়ে নেওয়ার ভূমিকা থেকে বেরিয়ে এসে সরাসরি নীতি প্রণয়নের অংশীদারে পরিণত হলো। প্রাতিষ্ঠানিক প্রোটোকল অনুযায়ী, কমনওয়েলথ সচিবালয়ের অর্থ, জনবল ও অভ্যন্তরীণ প্রশাসনের সঙ্গে জড়িত সব বিষয় তদারকি, নিরীক্ষা ও পরিচালনা করার একচ্ছত্র ম্যান্ডেট রয়েছে এই এক্সিকিউটিভ কমিটির (এক্সকো) হাতে।
আরও বড় বিষয় হলো, এই কমিটি নীতি নির্ধারণের প্রাথমিক ফিল্টার হিসেবে কাজ করে, যার প্রণীত কাঠামোগত সুপারিশগুলোই পরবর্তীতে পূর্ণাঙ্গ বোর্ড অব গভর্নরস বৈশ্বিক নীতি হিসেবে অনুমোদন করে।
বাংলাদেশ যখন এই আসনে বসার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন সবার চোখ মূলত ২০২৬-২০২৮ প্রশাসনিক চক্রের সম্ভাব্য কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত শীর্ষস্থানীয় কূটনৈতিক সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে যে, বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর জন্য ডিজিটাল গভর্ন্যান্স কাঠামো তৈরি এবং জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা অর্থনীতিগুলোর অনুকূলে আরও সমতাভিত্তিক সম্পদ বরাদ্দের পক্ষে ওকালতি করতে এই অবস্থানকে ব্যবহার করতে চায় ঢাকা।
ভোটের পর এক শীর্ষ কূটনৈতিক কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত রূপান্তরের অভিজ্ঞতাকে সরাসরি এই বহুপাক্ষিক মঞ্চে তুলে ধরার এটি একটি চমৎকার সুযোগ। ঢাকা এখন থেকে কেবল প্রশাসনিক নির্দেশনাবলী গ্রহণকারী দেশ হিসেবে থাকবে না, বরং এই নীতিমালা প্রণয়নে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে।’
বাজেট তদারকির পাশাপাশি কমনওয়েলথ নেটওয়ার্কের নতুন আবেদনকারী দেশ এবং অনুমোদিত সংস্থাগুলোর (এও) সদস্যপদ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে যাচাই-বাছাই করার সংবেদনশীল দায়িত্বও এই কমিটির ওপর ন্যস্ত থাকে। এর অর্থ হলো, কমনওয়েলথের আনুষ্ঠানিক মর্যাদা পেতে চাওয়া বিভিন্ন নাগরিক সমাজ, আইনি সংস্থা এবং পেশাজীবী সংগঠনগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক গ্রহণযোগ্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।