ইরানে নতুন করে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হওয়া ঠেকাতে যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে, ঠিক তখনই দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে চরম কঠোর বার্তা দিয়েছেন নতুন সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনি। ইরানের ওপর আবার কোনো হামলা হলে কোনো প্রকার ভৌগোলিক সীমারেখা না মেনে তাৎক্ষণিক, ধ্বংসাত্মক ও কার্যকর জবাব দেওয়ার জন্য সেনাবাহিনীকে সর্বোচ্চ প্রস্তুত থাকার কঠোর কৌশলগত নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
বার্তা সংস্থা আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী ইরানে ফের যৌথ বিমান হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে—এমন খবরের মধ্যে তেহরানে কাতারের শীর্ষ জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকেরা শুক্রবার ও শনিবার টানা দুই দিন ধরে দীর্ঘ মধ্যস্থতা বৈঠক করেছেন। ঠিক এই সময়েই সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ কমান্ডারদের নিয়ে এক জরুরি বৈঠকে বসেন মোজতবা খামেনি। গত মার্চে তার বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই মোজতবার দেওয়া প্রথম কোনো বড় আনুষ্ঠানিক কৌশলগত দিকনির্দেশনা।
ইতিমধ্যে ওয়াশিংটন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য মোহসেন রেজাইয়ের কাছে একটি বিশেষ কূটনৈতিক চিঠি পাঠিয়েছেন বলে জানা গেছে। যদিও ট্রাম্প দাবি করেছেন চিঠিতে ইরানে জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছানোর বিষয় রয়েছে, তবে মূল আলোচনায় আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (IAEA) পরিদর্শনের বিনিময়ে সমুদ্র অবরোধ তোলা এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার মতো প্রস্তাবগুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে ইরান পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কোনো অবস্থাতেই দেশের বাইরে পাঠানো হবে না।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হ্যালোইনের এক অনুষ্ঠানে দাবি করেছেন, ১০ মিনিটের মধ্যে ইরানের অবশিষ্ট পারমাণবিক কেন্দ্র ধ্বংস করা সম্ভব। এর কঠোর জবাব দিয়ে ইরানের সেনাসদস্যদের মুখপাত্র মোহাম্মদ আকরামিনিয়া সতর্ক করেছেন, ট্রাম্প যদি ইসরায়েলের হয়ে আঞ্চলিক দুঃসাহসিকতা বজায় রাখেন, তবে যুদ্ধের দাবানল পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ইউরো-মার্কিন অক্ষকে হুঁশিয়ারি দিয়ে স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছেন, “পুরোনো ভূরাজনৈতিক সীমারেখা এখন অতীত। ইরানে আঘাত হানার পরিণতি পশ্চিমা বিশ্বের কল্পনার চেয়েও ভয়াবহ হবে।”
অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে ইরান ও মার্কিন বাহিনীর মধ্যকার স্নায়যুদ্ধ ও সামরিক উত্তাপ চরমে পৌঁছেছে। সম্প্রতি ড্রোন হামলা ও সামুদ্রিক মাইনের আঘাতে বেশ কয়েকটি তেলবাহী ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা, যার ফলে এই কৌশলগত প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পূর্বের স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে। অর্থনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, মার্কিন প্রশাসন যদি সমঝোতার বাইরে গিয়ে ফের সংঘাতের পথ বেছে নেয়, তবে তেহরানের সীমাহীন পাল্টা আঘাতে পুরো মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি এক অনিয়ন্ত্রিত ও দীর্ঘস্থায়ী ভয়াবহতার দিকে মোড় নেবে।