ব্যাটারি চার্জে অবৈধ লেনদেন ৩ হাজার কোটি টাকা

Reporter Name / ৪ Time View
Update : শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬

মিরপুরের বাসিন্দা ৫০ বছর বয়সি আলী হোসেন। দুই-তিন বছর আগেও তিনি প্যাডেল রিকশা চালিয়ে সংসার নির্বাহ করতেন। প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে আয় কমে গেলে দেড় মাস আগে ধার করে পুরোনো রিকশাটি ভেঙে ব্যাটারিচালিত রিকশা বানান। রিকশাটি সড়কে নামানোর আগে স্থানীয় প্রভাবশালীদের এককালীন টাকাও দিতে হয়েছে তাকে। চাঁদা দিতে হয় পুলিশের লাইনম্যানকেও। পরে থানা পুলিশ এবং ট্রাফিক ম্যানেজ করে অলিগলি ছাড়িয়ে রাজপথে বিনা বাধায় ব্যাটারি রিকশা চালান আলী হোসেন। তার মতো প্রতিদিন হাজারো মানুষ অলিগলি পেরিয়ে এখন প্রধান সড়কেও দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে। যানজট, দুর্ঘটনা ও সড়ক নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়ে এখন চরম বিশৃঙ্খলা প্রতিটি রাস্তায়। প্রতিদিন ঘটছে দুর্ঘটনা।

বিভিন্ন সংস্থার হিসাবে রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা ১০ থেকে ১২ লাখ পর্যন্ত হতে পারে। এই হিসাব ধরে শুধু চার্জ বাবদ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ কোটি টাকার লেনদেন হয়, যা মাসে ৩০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। বছরে এর পরিমাণ দাঁড়ায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। গ্যারেজে রিকশা রাখা, ব্যাটারি চার্জ দেওয়া, ভাড়া নেওয়া, ব্যাটারি ও যন্ত্রাংশ বিক্রি- সব মিলিয়ে প্রতিদিনই হচ্ছে বিপুল অঙ্কের লেনদেন। অথচ এসব কার্যক্রমের বড় অংশই রয়েছে সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও নিবন্ধনের বাইরে।

এসব যান তৈরি করছে কারা, গ্যারেজ চালাচ্ছে কারা, বিদ্যুৎ আসছে কোথা থেকে এবং প্রতিদিনের কোটি কোটি টাকার লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করছে কারা? এসব প্রশ্নেরও স্পষ্ট উত্তর নেই।

অনুসন্ধান ও পুলিশের একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, ঢাকা মহানগরে অন্তত ৭৬০টি গ্যারেজে ব্যাটারিচালিত রিকশা রাখা ও চার্জ দেওয়া হয়। এসব গ্যারেজে চার্জ বাবদ প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে।

গতকাল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক মো. আবদুস সালাম বলেছেন, ঢাকা শহরে ব্যাটারিচালিত ও যন্ত্রচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে নতুন পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। অনুমোদন ছাড়া যত্রতত্র ব্যাটারি রিকশা তৈরি বন্ধে নির্ধারিত কিছু কারখানা ঠিক করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

রাজধানীর ভাসানটেক বাজার এলাকায় অনুসন্ধানে দেখা যায়, বাজারের একটি মোড়কে কেন্দ্র করে মিরপুর-১৪, মাটিকাটা ও দেওয়ানপাড়া ব্রিজ পর্যন্ত অন্তত ১০০০ ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করে। প্রতিটি রিকশা থেকে প্রতিদিন ৫০ টাকা করে চাঁদা নেওয়া হয়। যারা প্রতিদিন টাকা দেন, তাদের প্রমাণ হিসেবে ছোট কার্ড দেওয়া হয়। আর যারা মাসিক ভিত্তিতে টাকা দেন, তাদের রিকশার পেছনের সিটে ছোট করে সিল ও স্বাক্ষর দেওয়া থাকে। একজন চালকের ভাষ্য, এ এলাকায় রিকশা চালাতে হলে নির্ধারিত টাকা দিতেই হয়। টাকা না দিলে গাড়ি চালাতে দেওয়া হয় না। স্থানীয় পুলিশও এসব লেনদেনে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।

এই হিসাব ধরলে পুরো ঢাকায় স্থানীয় প্রভাবশালী থেকে শুরু করে পুলিশের লাইনম্যানকে প্রতিদিন চাঁদা দিতে হয় প্রায় ৬ কোটি টাকা।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে নিয়মতান্ত্রিক লাইসেন্সিং ও নিবন্ধন কার্যক্রম চালু করা হলে একদিকে ই-রিকশা ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আসবে, অন্যদিকে সরকারের কোষাগারে রাজস্ব জমা হবে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গ্যারেজগুলো শুধু রিকশা রাখার জায়গা নয়, এগুলো একেকটি ছোট ব্যবসাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। রিকশার মালিকানা, ভাড়া, চার্জ, ব্যাটারি, মেরামত ও যন্ত্রাংশ-সবকিছুর সঙ্গে গ্যারেজ ব্যবসা যুক্ত। মিরপুর, বনানী ও উত্তরাসহ কয়েকটি এলাকায় কথা বলে জানা যায়, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ একাধিক ব্যাটারিচালিত রিকশা বা অটোরিকশা কিনে গ্যারেজে ভাড়া দেন। একটি রিকশা থেকে দৈনিক ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত জমা নেওয়া হয়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) ২০১৯ সালের এক গবেষণায় ঢাকায় ২ লাখের বেশি ব্যাটারিচালিত রিকশার কথা বলা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট গবেষকের মতে, তখনকার হিসাবে বর্তমানে এ সংখ্যা ১২ থেকে ১৫ লাখে পৌঁছে থাকতে পারে। সিপিডির তথ্যানুযায়ী, সারা দেশে প্রায় ৫০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা রয়েছে, যার মধ্যে ঢাকাতেই ২০ লাখের বেশি। জানা গেছে, ২০১০ সালে চীন থেকে আমদানি করা ইজিবাইকের আদলে দেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ব্যবহার শুরু হয়। নিরাপত্তাঝুঁকি ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে প্রথম দিকে ঢাকার প্রধান সড়কে এসব যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা ছিল। কিন্তু ২০২০-২১ সাল থেকে গভীর রাতে প্রধান সড়কে এসব রিকশার চলাচল বাড়তে থাকে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কিছু সময় ট্রাফিক পুলিশের উপস্থিতি কমে যাওয়ায় অবাধ চলাচল আরও বেড়েছে। বিলসের জ্যেষ্ঠ পরামর্শক ও প্রশিক্ষক খন্দকার আবদুস সালাম মনে করেন, ৫ আগস্টের পর ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা মহামারির মতো বেড়েছে।

তিনি জানান, আগে অনেক গ্যারেজ ও শ্রমিক আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে ছিল। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর আগের অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি পালিয়ে যাওয়ায় বা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ায় নতুন অনেকে এ ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন।

চাহিদার পাশাপাশি ব্যবসায় লাভও এই বিস্তারের অন্যতম কারণ। কামরাঙ্গীরচরের কয়েকজন গ্যারেজ মালিকের ভাষ্য, প্যাডেল রিকশার তুলনায় ব্যাটারিচালিত রিকশায় লাভ প্রায় দ্বিগুণ। চালাতেও শারীরিক পরিশ্রম কম। ফলে চালক ও মালিক- দুই পক্ষেরই আগ্রহ বাড়ছে।

গ্যারেজ ও চার্জিং পয়েন্টগুলোর একটি বড় অংশে বিদ্যুৎ ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। কোথাও আবাসিক সংযোগ ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে রিকশা চার্জ দেওয়া হচ্ছে। কোথাও আবার বিদ্যুতের খুঁটি থেকে সরাসরি হুকিং করে বিদ্যুৎ নেওয়ার চিত্রও পাওয়া গেছে। কামরাঙ্গীরচরের মুন্সিহাটি, নবীনগর, নয়াগাঁও ও ঝাউলাহাটিসহ কয়েকটি এলাকায় এমন তথ্য পাওয়া গেছে। পল্লবীর বিভিন্ন বিহারি ক্যাম্প এলাকাতেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে।

ডেসকোর পল্লবী সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী তাজউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, ব্যাটারিচালিত রিকশার অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে কয়েকটি গ্যারেজের মালিক তাদের সংযোগ বৈধ বলে দাবি করেছেন। কোথাও অভিযোগ থাকলেও সংশ্লিষ্ট মালিক মন্তব্য করতে রাজি হননি। ব্যাটারিচালিত রিকশার বিস্তার ঠেকাতে ২০২৪ সালের ১৫ মে তৎকালীন সরকার এসব যান বন্ধের ঘোষণা দিয়েছিল। চালকদের আন্দোলনের মুখে পাঁচ দিনের মাথায় সিদ্ধান্ত স্থগিত হয়। পরে প্রধান সড়ক বাদে অন্যান্য সড়কে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়। হাই কোর্টেও বিষয়টি গড়ায়। আদালতের নির্দেশ এবং পরবর্তী স্থগিতাদেশের মধ্যেও রাজধানীর সড়কে এসব যান চলাচল অব্যাহত রয়েছে।

পরিবেশের জন্যও রয়েছে বড় ঝুঁকি। ব্যাটারিচালিত রিকশায় ব্যবহৃত লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি নিয়ে পরিবেশবিদদের উদ্বেগ রয়েছে। সিপিডির তথ্যানুযায়ী, এসব থ্রি-হুইলারে ব্যবহৃত লেড ব্যাটারির দূষণে দেশের প্রায় সাড়ে ৩ কোটি শিশু স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে।

সিস্টেম লসের আড়ালে বিদ্যুৎ চুরি : ব্যাটারিচালিত রিকশার গ্যারেজ ও চার্জিং পয়েন্টকে ঘিরে বিদ্যুৎ চুরির অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘সিস্টেম লস’-এর প্রশ্নও। উন্নত দেশগুলোতে যেখানে সিস্টেম লস ৬ শতাংশের আশপাশে, বাংলাদেশে তা বছরের পর বছর ১০ শতাংশের বেশি থাকার কথা বলা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সিস্টেম লস মাত্র ১ শতাংশ কমানো গেলেও বছরে অন্তত ১ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় সম্ভব।

বিদ্যুৎ খাতের বড় ধরনের অনিয়ম, চুরি ও দুর্নীতির সঙ্গে এ খাতের অব্যবস্থাপনাও যুক্ত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াট হলেও উৎপাদন সক্ষমতা ৩৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। ফলে সক্ষমতার চার্জসহ বিভিন্ন খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। একই সময়ে গ্যাস, কয়লা ও ফার্নেস অয়েল আমদানিনির্ভর হওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) আনিছুর রহমান জানিয়েছেন, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও এসব গ্যারেজে ব্যবহৃত বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে একটি বড় বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
deneme bonusu veren siteler - canlı bahis siteleri - casino siteleri casino siteleri deneme bonusu veren siteler canlı casino siteleri cURL Hatası: OpenSSL SSL_connect: SSL_ERROR_SYSCALL in connection to lkl.dolarkurum.com:443
deneme bonusu veren siteler - canlı bahis siteleri - casino siteleri casino siteleri deneme bonusu veren siteler canlı casino siteleri cURL Hatası: OpenSSL SSL_connect: SSL_ERROR_SYSCALL in connection to lkl.dolarkurum.com:443