ইরানের হত্যাকাণ্ড : নিরাপদে হাসছেন ট্রাম্প

Reporter Name / ৩ Time View
Update : শুক্রবার, ৩ এপ্রিল, ২০২৬

কিশোরী অ্যান ফ্রাঙ্কের নাম একসময় অনেকেই জানতেন। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে। ইহুদি বংশোদ্ভূত মেয়েটি তার পরিবারের সঙ্গে হিটলারের নাৎসি বাহিনীর হাতে বন্দি হয়েছিল, একটি নির্যাতনশালায়। বন্দি অবস্থাতেই তার মৃত্যু ঘটে। যেমনটা ঘটেছিল তার পরিবারের সব সদস্যের সঙ্গে অসংখ্য ইহুদি বন্দির। নির্যাতনের অবধি ছিল না। অ্যান ফ্রাঙ্ক অসামান্য ছিল, বিশেষ করে এই দিক থেকে যে চরম নির্যাতন ও হতাশার মধ্যেও সে ভেঙে পড়েনি। স্থিরচিত্তে নিজের অভিজ্ঞতাগুলো তার ডায়েরিতে লিখে রেখেছে। জন্ম তার ১৯২৯-এ, প্রাণ হারায় ১৯৪৫-এ। অর্থাৎ বেঁচে ছিল মাত্র ১৬ বছর। অত অল্প বয়সে প্রাণ না হারালে মেয়েটি নিশ্চয়ই আরও বড় মাপের সাহিত্য সৃষ্টি করতে পারত, যার সম্ভাবনা তার দিনলিপির পাতায় পাতায় পরিস্ফুট। অ্যান চলে গেছে, কিন্তু তার ডায়েরিটি বেঁচে গিয়েছে। নাৎসিদের পরাজয়ের পর ১৯৪৭ সালে ডায়েরিটি মুদ্রিত হয়ে প্রকাশ পায়। সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ভাষায় সেটির অনুবাদ হতে থাকে এবং বিশ্ববাসীর কাছে নাৎসিদের বর্বরতার একটি জীবন্ত দলিল হিসেবে গৃহীত হয়।

অ্যান ফ্রাঙ্কের প্রাণহরণের ৮০ বছর পরে ২০২৬ সালে নিপীড়িত ইহুদি জনগোষ্ঠীর জায়েনবাদী অংশের নায়ক নেতানিয়াহুর সহযোগী এবং তার চেয়েও ভয়াবহ ব্যক্তি, ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে পরিচালিত এক হামলায় অ্যান ফ্রাঙ্কেরই বয়সি (অনেকের হয়তো কিছু কম হবে) ১৬৫ জন ইরানি কন্যাশিশু ও কিশোরী একসঙ্গে প্রাণ হারিয়েছে। অ্যানের মতোই তারাও ছিল সম্পূর্ণ নিষ্পাপ এবং অ্যানের মতোই তাদের একমাত্র ‘অপরাধ’ ছিল তাদের জাতিগত পরিচয়। অ্যান ছিল ইহুদি; কিন্তু ইরানের ওই ১৬৫ জন কন্যাশিশুর জন্মগত পরিচয়ে ছিল মুসলমান। বেঁচে থাকলে কে জানে এদের মধ্যে কেউ অ্যান ফ্রাঙ্কের মতো অসাধারণ একজন হয়ে উঠতে পারত কি না! তা বিশ্ব খ্যাতি অর্জন করুক বা না-ই করুক, এদের প্রত্যেকেরই তো ছিল বেঁচে থাকবার অধিকার। যে অধিকার নিঃশেষ করে দেওয়া হয়েছে অ্যান ফ্রাঙ্কেরই ধর্ম সম্প্রদায়ভুক্ত নেতানিয়াহু এবং তাঁর বড় ভাই খ্রিষ্টান ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে। যিশুখ্রিষ্ট এসেছিলেন শান্তির বাণী নিয়ে। ডোনাল্ড ট্রাম্পও দ্বিতীয় মেয়াদে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হয়ে এবং ধর্মগ্রন্থ ছুঁয়ে শপথ নিয়ে আগ বাড়িয়ে ঘোষণা করেছিলেন ‘অন্তহীন’ যুদ্ধগুলোর অবসান ঘটিয়ে বিশ্বে তিনি শান্তির বন্যা বইয়ে দেবেন। এবং শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার পাবেন বলেও আশা রেখেছিলেন, কেবল যে বুকের গোপন কুঠরিতে তা নয় মুখর মুখেও। সেটা না পাওয়াতে তিনি অসন্তুষ্ট হয়েছেন। পুরস্কারটি পেয়েছেন অবশ্য তাঁরই আজ্ঞাবহ হতে সর্বদা-প্রস্তুত ভেনিজুয়েলার এক রাজনীতিবিদ। তবে সে পাওয়াতেও ট্রাম্প সাহেবের শান্তি কোথায়? নোবেল না পাওয়ার ক্রোধেই যে তিনি বিশ্বকে ছারখার করে দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা নিশ্চয়ই নয়। তাঁর আবির্ভাব আসলে যিশুখ্রিষ্টের উল্টো ভূমিকা পালনের জন্যই। এবং সেটা হচ্ছে মানবিক ও প্রাকৃতিক উভয় দিক থেকেই, বিশ্বকেই যতটা পারা যায় নষ্ট করে ফেলা। নষ্টের রাজা তিনি। যৌন নিপীড়নসহ নানা ধরনের অপরাধে অপরাধী সাব্যস্ত এপেস্টাইন নামে অধুনা-জগৎবিখ্যাত এক সফল ব্যবসায়ীর সঙ্গেও তাঁর খাতিরের নথি প্রকাশিত হওয়া শুরু করেছে। সমগ্র বিশ্বের বিরুদ্ধে তিনি যে শুল্কযুদ্ধ জারি করেছেন, তাতে মানুষের জীবন-ব্যয় খোদ আমেরিকাতেও বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এবং তাঁর জনপ্রিয়তার পারদ দ্রুত নিচের দিকে নামছিল। এ অবস্থায় দুকান কাটা-যাওয়াদের মতো মানসম্মানের ক্ষেত্রে তিনি অবশ্য প্রায় সর্বহারাই। কেউ কেউ বলছে লোকটি উন্মাদ, কেউ বলছেন মাতাল। মনে হয় দুটোই সত্য। ক্ষমতালোলুপতার উন্মাদনা তাঁকে গ্রাস করেছে। এবং তিনি আচরণ করছেন আত্মনিয়ন্ত্রণহীন মাতালের মতো। তাঁকে গুন্ডা বললেও অপমান করা হয় না। আসলেই তাঁর অনেক মুখ, তদুপরি মুখোশও বিবিধ।

ইতোমধ্যে আমেরিকার মানুষ, সবাই না হলেও অনেকেই টের পেয়ে গেছে যে লেজে আগুন-লাগা হনুমানের মতো ট্রাম্প সাহেব যে খেলাটা খেলছেন, সেটা আমেরিকার যুদ্ধ নয়, ইসরায়েলের ফিলিস্তিন দখলের প্রচেষ্টামাত্র। আর এটাও তাদের কাছে অস্পষ্ট নেই যে যেটাকে যুদ্ধ বলা হচ্ছে, সেটা মোটেই যুদ্ধ নয়; নির্লজ্জ এবং বর্বর হামলা। হামলার প্রথমটি ছিল এমন অতর্কিত যে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা, তাঁর কয়েকজন ঘনিষ্ঠজনসহ ৪২ ব্যক্তি একসঙ্গে প্রাণ হারিয়েছেন। পরবর্তী হামলাগুলোতে নিহত হয়েছে অসংখ্য মানুষ, এবং স্কুলে পড়তে আসা ১৬৫ জন কন্যাশিশু।

দেশের একটি জাতীয় দৈনিক শিশু-হত্যার ওই খবরটি দিয়েছে এভাবে : ‘তারা পড়ত খেলত একসঙ্গে, শুয়ে থাকবে পাশাপাশি। মাত্র কয়েক দিন আগে তাদের চাঞ্চল্যে মুখর থাকত যে পরিবেশ সেটা ভারী হয়ে উঠেছে পাথরের মতো তাদেরই নীরবতায়। ডুকরে কেঁদে উঠেছে হাজারো মানুষ।[…] ইরানের পতাকায় ছোট ছোট কফিনগুলো ঢেকে দেওয়া হয়েছে।’ ওই শিশুদের তো অন্য কোনো অপরাধ ছিল না, ইরানি পরিচয়টি ছাড়া; কিন্তু সে পরিচয়টি ওই শিশুরা মুছে ফেলবে কী করে? মৃত্যুর পরে অবশ্য তাদের অতিরিক্ত এই পরিচয়টিও রয়ে যাবে যে তারা শহীদ হয়েছে পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদীদের নৃশংস অস্ত্রাঘাতে।

শিশু হত্যাকারী কাপুরুষরা অস্ত্র হাতে স্থলপথে আসেনি। এলে প্রতিহত হতো। তারা হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে দূরে বসে, নিরাপদে থেকে, আকাশপথে মিসাইল ছুড়ে। এমন হত্যাকাণ্ড অনুন্নয়নের যুগে সম্ভব ছিল না, আজ সভ্যতা ও বিজ্ঞান উভয়েই যখন উন্নতির চূড়ান্ত স্তরে গিয়ে পৌঁছেছে, তখনই এটা সম্ভব হয়েছে। বিজ্ঞান এখন অত্যাচারীদের ক্রীতদাস বৈ অন্য কিছু নয়। ইসরায়েলের নেতানিয়াহুর একার পক্ষে ওই তা-বলীলা অসম্ভব হতো, যদি বড়ভাই ট্রাম্পের সহায়তা না পেত। তাদের তাণ্ডব কেবল যে বস্তুগত ধ্বংসলীলা ও গভীর অর্থনৈতিক ক্ষতেরই সৃষ্টি করছে তা নয়, শিশু, নারীসহ নিরীহ মানুষকে হত্যার ক্ষেত্রেও নতুন ধরনের রেকর্ড প্রতিষ্ঠা করেছে। ১৪ মার্চ পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে প্রকাশ পেয়েছে যে যৌথ হামলায় ইরানে প্রাণ হারিয়েছে ১ হাজার ৪৪৪ জন; লেবাননের ৮২৬ জন। এর বিপরীতে ইরানের জবাবে ইসরায়েলিদের মৃত্যুসংখ্যা সর্বমোট ১৪ জন। ১৪ জনের বেশি মানুষ তো আমাদের এই অনুন্নত দেশে এক দিনেই প্রাণ হারাচ্ছে। একটি মাত্র সড়ক দুর্ঘটনাতেই।

জর্জ ডব্লিউ বুশ যখন ইরাক আক্রমণ করেন, তার আগে অন্তত এক মাস তিনি আমেরিকার মানুষের সমর্থন আদায়সহ বিশ্বজনমতকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ধরনের প্রচার চালিয়েছিলেন। ট্রাম্পের কর্মসূচিতে ওসবের বালাই নেই। জর্জ বুশের আচরণ দেখে মনে হয়েছিল নতুন হিটলারের অভ্যুদয় ঘটেছে। কিন্তু ট্রাম্পের কাণ্ডকারখানা দেখে তো স্বয়ং হিটলারই লজ্জা পাচ্ছেন, করবে শুয়ে।

হিটলার তবু দেখাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে ইহুদিরা জার্মানদের অর্থনৈতিক জীবনের ওপর কর্তৃত্ব করছে। তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়েছিল ওই সম্প্রদায়ের ধনীদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা। কিন্তু কোথায় ইরান আর কোথায় আমেরিকা? ইরানের মানুষ তো আমেরিকার জন্য বিন্দুমাত্র হুমকি তৈরি করেনি। গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে, ইরাকের বিরুদ্ধে বুশ এই অভিযোগ দাঁড় করাবার চেষ্টা করেছিলেন। সেটা যে ভুয়া ছিল তা প্রমাণিত হওয়াতে এবং ইরাকে ধ্বংস ছাড়া তাঁর পক্ষে অন্য কিছু ঘটানো যে সম্ভব হয়নি সেটা দেখে পরবর্তী সময়ে তিনি কিছুটা লজ্জাতেও পড়েছিলেন। কিন্তু আমেরিকার নতুন নায়কের না আছে লজ্জা, না আছে ভয়। তাঁর জন্য হারাবার কিছু নেই এবং জগৎ খোলা রয়েছে জয় করবার। সেটাই তিনি করতে চান। ভেনিজুয়েলার নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে তিনি অপহরণ করে নিয়ে যান। বলেন বিচার করবেন। বেচারার অপরাধ প্রতিবেশী হয়েও ট্রাম্প সাহেবকে নিয়মিত সালাম না জানানো। আরও বড় অপরাধ ভেনিজুয়েলার বিপুল পরিমাণ তেলের মজুতের ওপর মার্কিনি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় সুযোগ দানে অসম্মতি। ইরানকে ট্রাম্প কাবু করবেন; কারণ ইরান বেয়াদবের মতো আচরণ করে এবং ইরানকে দমাতে পারলে তেলসমৃদ্ধ গোটা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিনি আধিপত্য একচ্ছত্র হবে। ইরানের পরে বিশাল আমেরিকার অতিশয় ক্ষুদ্র প্রতিবেশী ‘বেয়াদব’ কিউবার ওপর যে হামলা চালাবেন, সে ঘোষণা তো দিয়েই রেখেছেন। গ্রিনল্যান্ডই বা স্বতন্ত্র থাকবে কেন, আমরা নিয়ে নেব। এসব কথা বলে জনগণকে সন্তুষ্ট রাখবেন, এবং পারলে ক্ষেপিয়ে তুলবেন, এই হলো অভিসন্ধি। ওদিকে ইউরোপই বা বাদ যাবে কোন দুঃখে, তার মেরুদন্ডও ভেঙে দেওয়া দরকার। সারা দুনিয়া হবে আমেরিকার পদানত। সে লক্ষ্যে ইউরোপকেও ভাগ করে ফেলা চাই। পুতিন যে ইউক্রেন আক্রমণ করেছিলেন, সে কাজের অজুহাত ছিল ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দেবে এই শঙ্কা। চিন্তাটা যে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ছিল তা-ও নয়। ন্যাটোর বাহুতে মূল শক্তি জোগাত আমেরিকা। আমেরিকার সমর্থনই ছিল ইউক্রেনের জন্য ভরসা। ইউক্রেন আক্রান্ত হলে সেখানকার মানুষ যে দুর্দশায় নিক্ষিপ্ত হয়েছিল, তাতে ইউরোপজুড়ে প্রতিবাদ তো বটেই, ক্রন্দনের ধ্বনিও শোনা গিয়েছে। আমেরিকাও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যত প্রকার সাহায্য প্রয়োজন, দুহাতে তা সরবরাহ করবে। ইরানের ওপর হামলার সময় ট্রাম্প কিন্তু ন্যাটো তার সঙ্গে থাকবে কি থাকবে না, তা নিয়ে চিন্তাও করেননি, নেমে পড়েছেন মানুষ হত্যার অভিযানে। ভয় কীসের? খামেনি ও তাঁর কমান্ডারদের ভয় থাকে আক্রান্ত হবার এবং প্রাণ হারানোর। বিশেষ করে দেশের অভ্যন্তরে মার্কিনি ও ইসরায়েলি গুপ্তচরেরা সক্রিয় থাকায় ট্রাম্প তো নিরাপদে হাসছেন এবং হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন মেঘের আড়ালে থেকে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
deneme bonusu veren siteler - canlı bahis siteleri - casino siteleri casino siteleri deneme bonusu veren siteler canlı casino siteleri error code: 520
deneme bonusu veren siteler - canlı bahis siteleri - casino siteleri casino siteleri deneme bonusu veren siteler canlı casino siteleri error code: 520