সেই মাসুদ চৌধুরী গ্রেপ্তার

Reporter Name / ২ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ, ২০২৬

বহুল আলোচিত এক-এগারো কাণ্ডের অন্যতম কুশীলব সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গতকাল গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রাজধানীর পল্টন থানার মানব পাচার মামলায় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। গতকালই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের নির্দেশে তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।

পুলিশ বলছে, এই মামলায় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি ছিল। তার বিরুদ্ধে ঢাকা এবং ফেনীতে হত্যাসহ মোট ১১টি মামলা রয়েছে।

গতকাল বেলা ২টায় রাজধানীর মিন্টো রোডে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম।

তিনি বলেন, সোমবার রাতে রাজধানীর বারিধারা থেকে সাবেক এমপি মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে ফেনী জেলায় ছয়টি এবং ঢাকা মহানগর এলাকায় পাঁচটি মামলা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে তাকে পল্টন থানার একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে থাকা ১১টি মামলার মধ্যে ফেনী জেলার তিনটির বিচার কার্যক্রম চলমান। মামলা বিচারাধীন অবস্থায় তিনি পলাতক ছিলেন। এ কারণে তার বিরুদ্ধে আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন।

জানা গেছে, ২৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও মানব পাচারের অভিযোগে অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।

গতকাল তাকে আদালতে হাজির করে পাঁচ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, ডিবি পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) বিভাগের এসআই রায়হানুর রহমান।

রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগরের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ডের পক্ষে শুনানি করেন। অন্যদিকে মাসুদ উদ্দিনের পক্ষে তার আইনজীবীরা রিমান্ডের বিরোধিতা করে জামিন আবেদন করেন।

শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম মো. আমিনুল ইসলাম জুনাইদ জামিন নাকচ করে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে আদালতে তোলার আগে প্রিজন ভ্যান থেকে নামার পরই আদালত চত্বরে থাকা জনতা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে লক্ষ্য করে কাদা মিশ্রিত পানি এবং ডিম ছুড়ে মারেন।

এক-এগারোর পট পরিবর্তনের পর জরুরি অবস্থার মধ্যে জেনারেল মাসুদ রাজনৈতিক নেতাদের নির্যাতনের ‘মাস্টারমাইন্ড’ ছিলেন বলে যে ধারণা আছে, সে বিষয়ে পুলিশ তদন্ত করবে কি-না জানতে চাইলে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, তদন্তে আমরা যদি এটা পাই, তখন অবশ্যই যথাযথ ব্যবস্থা নেব। অন্যায়কারী যেই হোক, পার পাবে না। এরকম যদি কোনো বিষয় আসে, বা এরকম যদি কেউ থাকে যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, সেক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত যে কারও অধিকার আছে আইনের আশ্রয় নেওয়ার। এখনো যদি নেয়, আমরা তাকে ওয়েলকাম জানাব।

সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে রাজধানীর পল্টন, বনানী, কোতোয়ালি, মিরপুর ও হাতিরঝিল থানায় হত্যা, হত্যাচেষ্টা, মানব পাচারসহ বিভিন্ন গুরুতর অপরাধের অভিযোগে মামলা আছে। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) একাধিক অভিযোগ রয়েছে, যা বর্তমানে তদন্তাধীন। পল্টন থানার মানব পাচার মামলার তিন নম্বর এজাহারভুক্ত আসামি মাসুদ উদ্দীন। এই মামলায় মোট ১০১ জন আসামি।

মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ২০০৭ সালে সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের জিওসির দায়িত্বে ছিলেন। এক-এগারোর পট পরিবর্তনে অন্যতম প্রধান ভূমিকায় ছিলেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, অনেক রাজনৈতিক নেতাকে উঠিয়ে নিয়ে দিনের পর দিন নির্মম নির্যাতনের অন্যতম মাস্টারমাইন্ড ছিলেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। একই বছর তিনি মেজর জেনারেল থেকে পদোন্নতি পেয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হন। সে সময় তিনি গুরুতর অপরাধ দমন সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির সমন্বয়ক ছিলেন। এই কমিটির অধীনেই তখন দুর্নীতিবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়। এই কমিটির নির্দেশে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ রাজনীতিকদের পাশাপাশি দেশের শীর্ষ কয়েকজন ব্যবসায়ীকেও সে সময় আটক করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, তার অধীনস্থ ব্যাটালিয়নের সহযোগিতায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ভবন, বঙ্গভবনের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করা হয়। তিনি সশস্ত্র বাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালে মাসুদ উদ্দিন অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার নিযুক্ত হন। এরপর আওয়ামী লীগ সরকার তিন দফায় তার চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধি করে। অবসর গ্রহণের পর তিনি ঢাকায় রেস্তোরাঁ, আদম ব্যবসাসহ একাধিক ব্যবসায় যুক্ত হন।

মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী জাতীয় পার্টির (জাপা) মনোনয়নে দুই দফায় ২০১৮ এবং ২০২৪ সালে ফেনী-৩ আসনের (সোনাগাজী-দাগনভূঞা) এমপি ছিলেন। ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনী-৩ আসনে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী প্রথমে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়ে ফরম কিনে জমা দিয়েছিলেন। পরে তিনি জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। দলটির নীতিনির্ধারণী পর্ষদ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যপদ পান তিনি। জাপার মনোনয়নে নির্বাচন করেন।

মামলার এজাহারে যা উল্লেখ করা হয়েছে : ২০০৭-০৮ সময়ের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ের আলোচিত সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি রিক্রুটিং এজেন্সির এমডি। ওই কোম্পানির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ ও মানব পাচারের অভিযোগেই গত বছর ৩ সেপ্টেম্বর পল্টন থানায় এ মামলা দায়ের করেন আফিয়া ওভারসিজের প্রোপাইটর আলতাব খান। এ মামলায় আওয়ামী লীগ আমলের প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ইমরান আহমেদ, সচিব ড. আহমেদ মুনিরুছ সালেহীন, আহমেদ ইন্টারন্যাশনালের প্রোপাইটর ও সাবেক এমপি বেনজীর আহমেদ এবং ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনালের প্রোপাইটর মো. রুহুল আমীন স্বপনসহ ১০৩ জন আসামি।

মামলার এজাহারে বাদী আলতাব খান অভিযোগ করেছেন, জনশক্তি রপ্তানিতে দুই হাজারের বেশি রিক্রুটিং এজেন্ট থাকলেও মামলার আসামিরা সিন্ডিকেট করে ব্যবসায়ীদের মধ্যে বৈষম্য তৈরি করেন। মামলার আসামি সচিব আহমেদ মুনিরুছ সালেহীন সরকারি চাকরিরত অবস্থায় নিজ মন্ত্রণালয়ের অধীনে তার ছেলেকে সিন্ডিকেট চক্রের সদস্য হিসেবে ব্যবহার করেন। আর সাবেক প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ইমরান আহমেদ তার স্ত্রীর বড় ভাইয়ের ছেলেকে বিধিবর্হিভূতভাবে ‘প্রবাসী’ নামে একটি অ্যাপ চালু করার অনুমোদন দিয়ে ওই চক্রকে সহযোগিতা করেন।

বাদীর অভিযোগ, মামলার আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে তার সরলতার সুযোগ নিয়ে ভয়ভীতি ও বলপ্রয়োগ করে মানব পাচারের উদ্দেশ্যে তার কাছ থেকে অতিরিক্ত চাঁদা হিসেবে মাথাপিছু দেড় লাখ টাকা হারে ৮৪১ জনের কাছ থেকে ১২ কোটি ৫৬ লাখ ১ হাজার টাকা আদায় করেছে। ওই চক্র অন্যান্য ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা চাঁদা আদায় করে আত্মসাৎ করেছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
deneme bonusu veren siteler - canlı bahis siteleri - casino siteleri casino siteleri deneme bonusu veren siteler canlı casino siteleri error code: 520
deneme bonusu veren siteler - canlı bahis siteleri - casino siteleri casino siteleri deneme bonusu veren siteler canlı casino siteleri error code: 520