বাংলাদেশ ও ভারত একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি স্বাক্ষরের লক্ষ্যে আলোচনা জোরদার করেছে ঢাকা-দিল্লি। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধি, শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দূর, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং অর্থনৈতিক একীকরণ গভীর করার উদ্দেশ্যে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। প্রস্তাবিত চুক্তির অন্যতম লক্ষ্য হলো ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পরও ভারতের বাজারে সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা। পাশাপাশি এ চুক্তির মাধ্যমে ব্যবসাবাণিজ্য, সরবরাহ চেইন, সেবা খাত, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সরকারি সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য সময় নির্ধারিত থাকলেও সরকার ইতোমধ্যে তিন বছর সময় বাড়ানোর আবেদন করেছে। এ প্রেক্ষাপটে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তিকে ভবিষ্যৎ বাণিজ্যনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আলোচনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি প্রচলিত মুক্তবাণিজ্য চুক্তির তুলনায় অধিক বিস্তৃত। এতে পণ্য বাণিজ্যের পাশাপাশি সেবা খাত, বিনিয়োগ সহজীকরণ এবং নিয়ন্ত্রক সহযোগিতার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
এ চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ তৈরি পোশাক, ওষুধ ও কৃষিপণ্যের জন্য ভারতের বাজারে আরও ভালো প্রবেশাধিকার পেতে আগ্রহী। একই সঙ্গে দেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে ভারতীয় বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে দুই দেশ প্রথম সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু করে এবং একটি যৌথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়। পরবর্তীতে উভয় দেশের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমীক্ষা সম্পন্ন করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদন পর্যালোচনার পর মন্ত্রণালয় মত দেয় যে, এলডিসি উত্তরণের পরও সাফটা চুক্তির সুবিধা ধরে রাখতে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, ভৌগোলিক নিকটতা থাকা সত্ত্বেও অশুল্ক বাধা এবং লজিস্টিক জটিলতা-বিশেষ করে বেনাপোল-পেট্রাপোল স্থলবন্দর করিডর-দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে রয়ে গেছে। সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা এবং বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুকতাদির চুক্তির অগ্রগতি ত্বরান্বিত করার বিষয়ে একমত হন। উভয় পক্ষ দ্রুত কারিগরি আলোচনা সম্পন্ন করে চুক্তি চূড়ান্ত করার ওপর জোর দিয়েছে। তবে এখনো কিছু জটিল বিষয় সমাধান বাকি রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পণ্যের উৎস নির্ধারণ, অ্যান্টি-ডাম্পিং ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক মানের সমন্বয়।
এ ছাড়া সীমান্ত বাণিজ্য সুবিধা সম্প্রসারণ এবং রেল ও নৌপথসহ বহুমুখী যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের বিষয়েও আলোচনা চলছে, যা ভবিষ্যতে বাণিজ্য প্রবাহ বাড়াতে সহায়ক হবে। নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি কেবল একটি শুল্ক হ্রাস চুক্তি নয়, বরং এটি একটি কৌশলগত আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা কাঠামো, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশ-ভারত অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।
একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করা সম্ভব বলে আমরা আশা করছি। ভারতীয় পক্ষ এখনো প্রস্তুতি প্রক্রিয়ায় রয়েছে।