ঈদে ঘরমুখো যাত্রীদের নিয়ে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা চিলাহাটিগামী নীলসাগর এক্সপ্রেস আন্তনগর ট্রেনের ৯টি বগি লাইনচ্যুত হয়ে বগুড়ার আদমদীঘিতে দুই শতাধিক যাত্রী আহত হয়েছেন। বুধবার (১৮ মার্চ) বেলা আড়াইটার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। পরে আহতের উদ্ধার করে আদমদীঘি ও নওগাঁ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। দুর্ঘটনার পর থেকে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে ঢাকার রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। আহতদের আর্তনাদে সান্তাহার ও নওগাঁর আকাশ কান্নায় ভারী হয়ে যায়।
এদিকে এ দুর্ঘটনার দায়ে সান্তাহার সহকারী রেলস্টেশন মাস্টার শহিদুল ইসলাম রঞ্জুকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। ঘটনার পরপরই রেলের সরঞ্জামাদিসহ যাত্রীদের লাগেজ চুরি যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। নাকশতার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। ঘটনাস্থলে সিঙ্গেল লাইন হওয়ায় উত্তরবঙ্গের পাঁচ জেলা নীলফামারী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও জয়পুরহাটের সঙ্গে ঢাকার রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। কর্মকর্তারা বলছেন, ট্রেন চলাচল সচল হতে দুই দিন সময় লাগতে পারে। তবে বুধবার সন্ধ্যায় লাইনচ্যুত বগি সরিয়ে নিতে ঈশ্বরদী জংশন থেকে ঘটনাস্থলে এসেছে উদ্ধারকারী ট্রেন। কর্মকর্তারা উদ্ধার কাজ শুরু করেছেন।
জানা যায়, আসন্ন ঈদ উপলক্ষে শত শত যাত্রী নীলসাগর ট্রেনযোগে সান্তাহার হয়ে বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছিলেন। প্রতিদিনের ন্যায় এদিন সান্তাহার স্টেশনসংলগ্ন বাগবাড়ী নামক স্থানে রেললাইনের কাজ চলছিল। কিন্তু নীলসাগর ট্রেনটি কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘটনাস্থলে পৌঁছলে ৯টি বগি লাইনচ্যুত হয়ে যায়। এর মধ্যে এসি চেয়ার, শোভন চেয়ার, পাওয়ার কার, বগি ছিল। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রায় দেড় শতাধিক যাত্রীকে উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠিয়ে দিয়েছেন। এর আগে অনেক যাত্রী নিজ নিজ উদ্যোগে চলেও যান। ট্রেনের ছাদে অতিরিক্ত যাত্রী থাকায় বগিগুলো হেলে পড়ার সময় অনেকেই ছিটকে নিচে পড়ে আহত হন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি বলে নিশ্চিত করেছেন সান্তাহার রেলওয়ে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মাহফুজুর রহমান ও স্টেশন মাস্টার খাদিজা খাতুন। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে চার সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
কমিটির সদস্য ও বাংলাদেশ রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী আহমেদ হোসেন মাসুম জানান, কমিটিতে রেলওয়ের চিফ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, চিফ সিগন্যাল ইঞ্জিনিয়ার এবং চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট রয়েছেন।
তিনি বলেন, মনে হচ্ছে সিগন্যাল নিয়ে একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়ে থাকতে পারে। লোকো মাস্টার হয়তো সিগন্যাল পাননি অথবা ভালোভাবে ফলো করেননি। তবে তদন্ত শেষেই প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
আহমেদ হোসেন মাসুম আরও জানান, পাবনার ঈশ্বরদী ও দিনাজপুরের পার্বতীপুর থেকে দুটি রিলিফ ট্রেন দুর্ঘটনাস্থলে এসেছে। রিলিফ ট্রেন পৌঁছানোর পর উদ্ধার কাজ পুরোদমে শুরু হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে সারা রাতের মধ্যে লাইন সচল করা সম্ভব হবে।
এদিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন বগুড়া জেলা পুলিশ সুপার মির্জা সায়েম মাহমুদ। এ সময় তিনি বলেন, যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে এবং নিরাপত্তার খাতিরে জেলা পুলিশ সব ধরনের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত আছে। আমরা আশা করছি দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই লাইন সচল হবে।
রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকায় সান্তাহারসহ বিভিন্ন স্টেশনে আটকে পড়া যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। লাইনচ্যুত বগিগুলো সরিয়ে রেল চলাচল স্বাভাবিক করতে কাজ করে যাচ্ছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
আদমদীঘি এলাকার নাছির উদ্দিন জানান, আহতদের উদ্ধার করে সান্তাহার ও নওগাঁ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতদের চিৎকারে বাগবাড়ি এলাকার বাতাস ভারী হয়েছে। তিনি আরও বলেন, মানুষের বিপদের সময় অনেকেই যাত্রীদের হাতব্যাগ মোবাইলসহ লাগেজ চুরি যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
নাছির উদ্দিন বলেন, দ্রুতগতিতে চলন্ত ট্রেনটি হঠাৎ বিকট শব্দে লাইনচ্যুত হয়। মুহূর্তেই কয়েকটি বগি রেললাইন থেকে ছিটকে পড়ে। এতে যাত্রীদের মধ্যে চরম ভীতির সৃষ্টি হয় এবং অনেকে আতঙ্কে চিৎকার করতে থাকেন।
নওগাঁ সদর হাসপাতালের (আরএমও) আবুজার গাফফার বলেন, হাসপাতালে দুই শতাধিক আহত চিকিৎসা নিতে এসেছিলেন। তাদের মধ্যে অনেকেই গুরুতর আহত হয়ে কাতরাচ্ছিলেন। আবার অনেকেই প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে চলে গেছেন। এ ছাড়াও আদমদীঘি হাসপাতালে প্রায় ১৫ জন ভর্তি হয়েছিলেন। এর মধ্যে গুরুতর আহত দুজনকে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে।
সান্তাহার জংশন স্টেশনের অধীনে দায়িত্বে থাকা ওয়েম্যান সোহেল রানা বলেন, রেল ভেঙে যাওয়ার কারণে এখানে কাজ হচ্ছিল। কন্ট্রোল রুমে সিগন্যাল দেওয়া আছে। তারপরও লাল ব্যানার দেওয়া থাকে। সিগন্যাল ও লাল ব্যানার উপেক্ষা করে ট্রেনটি এসে দুর্ঘটনায় পড়ে। এমনকি হাতের সিগন্যালও মানেননি চালক।
সান্তাহার রেলস্টেশন মাস্টার খাদিজা খাতুন বলেন, কীভাবে এটা হলো এখন বলা যাবে না। পরবর্তীতে বলা যাবে। কারণ এখন এখানে ট্রেনের ড্রাইভার নেই।
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক ফরিদ আহমেদ জানান, সান্তাহারের দুর্ঘটনা অনুসন্ধানে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা হলেন রেলের প্রধান পরিবহন কর্মকর্তা, পশ্চিমাঞ্চল রেলের প্রধান প্রকৌশলী ও চিফ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে দুর্ঘটনার কারণ খুঁজে দ্রুত সময়ে রিপোর্ট দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মহাব্যবস্থাপক আরও জানান, তিনিসহ পশ্চিমাঞ্চল রেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। রিলিফ ট্রেন উদ্ধার অভিযান শুরু করেছে।
স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহ আলম এমপি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, যত দ্রুত সম্ভব উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে যেতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজকের এ রেল দুর্ঘটনা শুধুই দুর্ঘটনা কি না বা এতে কোনো ষড়যন্ত্র আছে কি না সে বিষয়ে দ্রুত তদন্ত জমা দেওয়ার জন্য বলেছেন। দুর্ঘটনার ফলে রেল যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ায় আমরা দেশবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করছি। দুর্ঘটনায় যারা আহত আছেন তাদের দ্রুত চিকিৎসার জন্য স্থানীয় হাসপাতাল ও প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।