ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক হামলা এবং এর জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে তেহরানের পাল্টা আক্রমণের মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করেছে ইরান।
ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড-এর এক কমান্ডারের বরাতে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালি এখন বন্ধ এবং কোনো জাহাজ এটি অতিক্রম করার চেষ্টা করলে সেটিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হবে।
গত শনিবার সকালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে ‘বৃহৎ সামরিক অভিযান’ শুরু করার পর এবং তার কিছুক্ষণ আগে তেহরানে ইসরায়েলি হামলার পর পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিপ্লবী গার্ড হরমুজ প্রণালিতে অবস্থানরত ট্যাংকারগুলোকে সতর্ক করে জানায়, কোনো জাহাজকে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে যেতে দেওয়া হবে না।
ওই সময় ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে অবরোধ নিশ্চিত না করলেও, ওমান উপকূলে একটি জাহাজে হামলার পর জাহাজগুলো প্রণালি এড়িয়ে চলছিল বলে জানা গেছে।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, রবিবার উপসাগরের উন্মুক্ত জলসীমায় অন্তত ১৫০টি ট্যাংকার নোঙর করে ছিল, যেগুলো অপরিশোধিত তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ও অন্যান্য তেলজাত পণ্য বহন করছিল।
হরমুজ প্রণালি বন্ধের ফলে জ্বালানি বাজারে স্থবিরতা বাড়বে। স্থবিরতা অব্যাহত থাকলে প্রতিদিন প্রায় দেড় কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল গন্তব্যে পৌঁছাতে বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ দিকে গেলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৬৭ ডলার থেকে বেড়ে ১০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু উন্নত অর্থনীতি চাপে পড়তে পারে, যেগুলো মূল্যস্ফীতির প্রভাব কাটিয়ে উঠতে ইতিমধ্যে হিমশিম খাচ্ছে।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি?
বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এবং সমুদ্রপথে পরিবাহিত গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে যায়। এটি উত্তরে উপসাগরকে দক্ষিণে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সবচেয়ে সরু স্থানে প্রণালিটির প্রস্থ মাত্র ৩৩ কিলোমিটার এবং উভয় দিকের নৌপথের প্রস্থ প্রায় ৩ কিলোমিটার।
এই ভৌগোলিক অবস্থান এটাকে ওপেকভুক্ত দেশগুলোর তেল এশিয়ার ক্রেতাদের কাছে পৌঁছানোর প্রধান পথ হিসেবে গড়ে তুলেছে। বিকল্প পথের সুযোগও সীমিত।
ইরানের জ্বালানি সক্ষমতা
ইরানের কাছে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম প্রমাণিত তেল মজুত রয়েছে—প্রায় ১৭০ বিলিয়ন ব্যারেল, যা বৈশ্বিক মজুতের প্রায় ৯ শতাংশ। ভেনেজুয়েলা, সৌদি আরব ও কানাডার পরেই এর অবস্থান। ওপেকের মধ্যে ইরান চতুর্থ বৃহত্তম তেল উৎপাদক এবং বিশ্বের অন্যতম বড় অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক।
এ ছাড়া, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রমাণিত গ্যাস মজুতও রয়েছে ইরানের, যা বৈশ্বিক গ্যাসের প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ। যদিও দশকের পর দশক রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে উৎপাদন কমে গিয়েছিল, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে উৎপাদন ঐতিহাসিক উচ্চতায় পৌঁছেছে বলে জানানো হয়েছে।