শান্তিরক্ষায় অনন্য বাংলাদেশ। শান্তিরক্ষীরা এ দেশকে গৌরবময় জাতি হিসেবে বিশ্বদরবারে তুলে ধরেছেন। আজ পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস। অনুষ্ঠান ঘিয়ে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
২০০৩ সাল থেকে প্রতি বছর আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস পালিত হয় ২৯ মে। এবার ঈদুল আজহার ছুটির কারণে পিছিয়ে দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে পালন করা হচ্ছে আজ। এ বছরের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে-শান্তিতে বিনিয়োগ। জাতিসংঘের ভাষ্য মতে, সীমিত সম্পদ ও জনবল দিয়ে সৃষ্ট সংঘাত মোকাবিলা করা, চলমান যুদ্ধ বন্ধ কিংবা বিরতির প্রশ্নে আলোচনা অব্যাহত রাখা। এ ছাড়া সব অবস্থায় বেসামরিক জনগণের জানমালের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করা এবং আগে নেওয়া উদ্যোগ ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সবাইকে মানবিক ভূমিকা পালন ও বিনিয়োগে উদ্বুদ্ধ করা। সংশ্লিষ্টরা জানান, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশ আস্থার প্রতীক। বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকি ও সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা পেশাদারি, সাহসিকতা ও মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে প্রশংসিত হয়েছেন। ইরান-ইরাক যুদ্ধের পর যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণে গঠিত মিশনের মধ্য দিয়ে ১৯৮৮ সালে মাত্র ১৫ জন সামরিক পর্যবেক্ষক দিয়ে যাত্রা শুরু। জাতিসংঘের সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, ৯টি মিশনে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশের ৪ হাজার ২১২ জন সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। যেখানে নেতৃত্ব, সংখ্যাগরিষ্ঠতা, আত্মত্যাগ, সুনাম অর্জনসহ সার্বিকভাবে সম্মুখ সারিতে অন্যতম প্রধান ভূমিকায় রয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। গোলযোগপূর্ণ দেশগুলোতে নিজেদের উচ্চ পেশাদারি, মানবিক ও সহযোগিতামূলক আচরণ দিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের হৃদয় জয় করছেন তারা। একইভাবে বাংলাদেশ নৌবাহিনী, বাংলাদেশ বিমানবাহিনী ও বাংলাদেশ পুলিশও নিজ নিজ ক্ষেত্রে স্বমহিমায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রায় ২ লাখ ৬ হাজার শান্তিরক্ষী বিশ্বের ৪৩টি দেশে ৬৩টিরও বেশি মিশনে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ পর্যন্ত ১৭৫ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী বিশ্বশান্তির জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। বিশেষ করে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে সামরিক সদস্য ও নারী পুলিশের অংশগ্রহণ বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে দিয়েছে অনন্য মর্যাদা। পেশাগত দক্ষতা আর কাজের প্রতি একাগ্রতা বাংলাদেশ শান্তিরক্ষীদের অবস্থানকে এখানে সুসংহত করেছে। তাদের দুর্দান্ত সাহসী ভূমিকা আর অবিশ্বাস্য সব ত্যাগ দিয়ে বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরছে গৌরবময় জাতি হিসেবে।
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন প্রসঙ্গে সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক জানান, বৈশ্বিক পরিস্থিতি, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বিনিয়োগ বাস্তবতা এবং চলমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে শান্তি প্রতিষ্ঠার ঐক্যকে পর্যালোচনা করে দুটি প্রেক্ষাপটে এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে। এগুলো হচ্ছে-বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, রাজনৈতিক পক্ষ-বিপক্ষ, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও নিয়ন্ত্রণ-এ বাস্তবতায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম টিকিয়ে রাখা। দ্বিতীয়ত-রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আর্থিক সহায়তা ও কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা চলমান রাখার প্রশ্নে আলোচনা চলমান রাখা। তিনি বলেন, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম নানান কারণে ও প্রেক্ষাপটে এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। একদিকে জনবল ও আর্থিক অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে বাড়ছে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত-সহিংসতা। এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৫ বছরের মধ্যে বর্তমানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বৈশ্বিকভাবে মিশনে নিয়োজিত সামরিক, পুলিশ ও বেসামরিক সদস্যদের সংখ্যা গত এক দশকে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এর কারণ হিসেবে যে বাস্তবতা উল্লেখ করা হয়েছে তা হলো-তহবিল সংকট, বড় শক্তিগুলোর রাজনৈতিক বিভক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ড্রোননির্ভর অপপ্রচার, সাইবার ঝুঁকি ও জটিল আঞ্চলিক সংঘাত শান্তিরক্ষীদের কাজকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
বাংলাদেশের শান্তিরক্ষী মিশন সংশ্লিষ্টরা জানান, ১৯৮৮ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের বিস্তৃত অর্জন ও সাফল্য রয়েছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশ বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি দেশের জাতীয় মর্যাদা বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে একটি বিশাল কূটনৈতিক সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে কাজ করে চলছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অর্জিত আয়ের একটি ক্ষুদ্র অংশ শান্তিরক্ষীরা পেয়ে থাকেন, আর এর সিংহভাগ দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। গত তিন যুগে শুধু বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন থেকে দেশের অর্থনীতিতে প্রায় ৩১ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা সংযোজিত হয়েছে। শান্তিরক্ষা মিশন থেকে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে। সিয়েরা লিওনের গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মানবিক ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০২ সালে দেশটিতে ‘বাংলা’কে সম্মানসূচক দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সম্প্রতি জাতিসংঘের ড্যাগ হ্যামারশোল্ড পদকে ভূষিত হয়েছেন ছয় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন করা সদস্যদের ভূমিকার প্রশংসা করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা বিশ্বশান্তি রক্ষায় যে ত্যাগ স্বীকার করেন, তা অনেকেই যথেষ্ট উপলব্ধি করেন না। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে ভালোবেসে ও দেশের সম্মান রক্ষায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা কাজ করে যাচ্ছেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাদের স্যালুট জানাই। বাংলাদেশের সরকারের পক্ষ থেকেও তাদের স্যালুট জানাই। বর্তমান সরকার নারী শান্তিরক্ষীদের সংখ্যা বাড়াতে গুরুত্ব দিচ্ছে বলেও জানান শামা ওবায়েদ।