ট্রাম্প প্রশাসন আর নেতানিয়াহু সরকারের সমস্ত হিসাব-নিকাশ উল্টে দিয়ে এক নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে ইরান। সৌদি আরবের তেলক্ষেত্রে ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্রগুলো শুধু যে ইরাক বা ইরান থেকে এসেছে তা নয়, বরং দক্ষিণ দিক অর্থাৎ ইয়েমেন থেকেও আঘাত হেনেছে। এই যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রমাণ করে দিয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন কার নিয়ন্ত্রণে। আপাতদৃষ্টিতে সুন্নি দেশগুলোর যে নতুন জোট গড়ে উঠছে, তারা হয়তো নিজেদের প্রকাশ্যে ইসরায়েল-বিরোধী বলবে না, কিন্তু পর্দার আড়ালের সত্য হলো এই জোটের অস্তিত্ব ইসরায়েলের জন্য কোনো শুভ বার্তা বয়ে আনছে না।
পরাজয়ের মুখ থেকে কোনোমতে মুখরক্ষা করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ একের পর এক বিভ্রান্তিকর পোস্ট দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি এখন ইরানকে অবাস্তবভাবে আব্রাহাম চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করার খড়কুটো আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করছেন। ট্রাম্প দাবি করছেন, ইরানের সাথে এই চুক্তি নাকি এক ঐতিহাসিক ঘটনা হবে এবং বিশ্বের বড় বড় নেতারা ইরানকে এই জোটে পেয়ে সম্মানিত বোধ করবেন। কিন্তু রূঢ় বাস্তব হলো, ট্রাম্পের এই অনুনয়-বিনয়কে রিয়াদ বা তেহরান পাত্তাই দিচ্ছে না, ওয়াশিংটনের ভাগ্যে জুটছে কেবলই এক বধির নীরবতা।
মাটির পৃথিবীর বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইরান এখন পারস্য উপসাগরের সবচেয়ে প্রভাবশালী খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ওমানের সাথে কাঁধ মিলিয়ে ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর কার্যত এমন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে, যা তারা আর কখনোই হাতছাড়া করবে না।
তেহরানের কাছে তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের চেয়েও এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ অনেক বেশি মূল্যবান। ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু যতই দাবি করুন যে তারা ইরানের বিমানবাহিনী বা নৌবাহিনী ধ্বংস করে দিয়েছেন, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র আর নৌ-মাইনের শক্তিতে বলীয়ান ইরানের প্রকৃত সামরিক ক্ষমতাকে তারা বিন্দুমাত্র স্পর্শও করতে পারেননি।
ইরান এখন হরমুজ প্রণালিকে পানির কলের মতো যখন খুশি চালু করতে পারে, আবার যখন খুশি বন্ধ করতে পারে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে চীনের দিকে রওনা হওয়া তেলবাহী ট্যাংকারগুলোর নির্বিঘ্ন চলাচলই প্রমাণ করে যে, এই অঞ্চলের বাণিজ্যপথের চাবিকাঠি এখন কার হাতে। এই বিজয় মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিরোধ আন্দোলনগুলোকে এক নতুন সঞ্জীবনী সুধা এনে দিয়েছে। পেজার বিস্ফোরণ আর একের পর এক বিমান হামলায় লেবাননের হিজবুল্লাহকে যারা মৃত বলে ধরে নিয়েছিল, তারা এখন দেখছে হিজবুল্লাহর এক নতুন প্রজন্মের উত্থান।
অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা হ্যাক হওয়ার পর হিজবুল্লাহর নতুন যোদ্ধারা এখন ফোন ধরা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে। এর বদলে তারা যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে এসেছে আধুনিক ‘এফপিভি ড্রোন’। এই ড্রোনের আঘাতে লেবানন সীমান্ত রক্ষা করতে তারা লেবানন সরকারের চেয়েও ঢের বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখছে। ইরানের এই প্রতিরোধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যকেও নাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্বমঞ্চে ট্রাম্পের মতো নেতাকে এখন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সামনে অসহায় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে, যেখানে জিনপিং সরাসরি তাইওয়ান নিয়ে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করছেন।
বিখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা যথার্থই বলেছেন যে, এখন আমেরিকারই ‘দুষ্ট রাষ্ট্র’ হিসেবে গণ্য হওয়ার পালা, আর চীন আবির্ভূত হচ্ছে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা ও শান্তি চুক্তির মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে। গত ২৫ বছরে কোনো যুদ্ধে না জড়ানো চীন এখন বিশ্বস্ততার প্রতীক। ইরানের এই মাথা নত না করার লড়াই আরব বিশ্বের সাধারণ মানুষকে এক শক্তিশালী বার্তা দিচ্ছে। সেই বার্তাটি হলো, যথেষ্ট সংকল্প আর চরম ত্যাগ স্বীকারের মানসিকতা থাকলে, মধ্যপ্রাচ্যের মাঝারি শক্তির দেশগুলোও মার্কিন ও ইসরায়েলি ঔপনিবেশিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে জয়ী হতে পারে।
যুদ্ধবিরতির চুক্তি স্বাক্ষরের পর পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা নিয়ে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, নেতানিয়াহু নিজের পরাজয় লুকাতে লেবানন ও গাজায় আরও তীব্র গতিতে বোমাবর্ষণ শুরু করবেন। লিটানি নদীর দক্ষিণের সমস্ত বাড়িঘর, গ্রাম ও শহর মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়ে তিনি নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে চাইবেন। হয়তো গাজাকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ করতে পুরো উপত্যকা দখল করার দুঃসাহসও তিনি দেখাবেন। কিন্তু ইতিহাস বলছে, এই আগ্রাসন হবে নেতানিয়াহুর নিজের রাজনৈতিক কবর খোঁড়ার শামিল, কারণ কোনো লক্ষ্য অর্জন ছাড়াই ইসরায়েলকে এই যুদ্ধ থেকে ফিরতে হবে।
ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু কেউই আজ নিজেদের দেশের মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে দাবি করতে পারবেন না যে তারা জয়ী হয়েছেন। ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের কাছে তাদের পরাজয় এখন সুনিশ্চিত। যুদ্ধ শেষ হওয়া মাত্রই ট্রাম্প হয়তো কিউবার ওপর অবরোধের মতো অন্য কোনো বিষয়ে মানুষের নজর ঘোরানোর চেষ্টা করবেন, যাতে গত তিন মাসের এই অজনপ্রিয় যুদ্ধের জবাবদিহিতা থেকে বাঁচা যায়।
ইসরায়েলের এই যুদ্ধ শুধু যে নতুন প্রজন্মের মার্কিন ইহুদিদের সমর্থন কেড়ে নিয়েছে তা নয়, বরং আমেরিকার কট্টর রিপাবলিকান খ্রিস্টানদের মনেও এখন এই ধারণার জন্ম দিয়েছে যে ইসরায়েল আসলে খোদ যুক্তরাষ্ট্রকেই দখল করে রেখেছে। এই চরম পরাজয়ের পর আবুধাবির মতো আরব রাজতন্ত্রের শাসকদের এখন তেহরানের ক্ষমতার পরিবর্তন নিয়ে ভাবার সময় নেই, বরং তাদের নিজেদের সিংহাসন আর কতদিন টিকবে, সেই চিন্তাই এখন তাদের প্রধান মাথাব্যথা।