ইরান যুদ্ধ শুরুর ১১ সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী এখনও কার্যত অচল। এই সংকট শুধু উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতিকেই নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও সরবরাহব্যবস্থাকেও গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) বর্তমানে কৌশলগত এই জলপথের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে।
অন্যদিকে, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধও রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত প্রণালীটি পুনরায় পুরোপুরি খুলে দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন ১২০ থেকে ১৪০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করতো। এর প্রায় অর্ধেক ছিল তেলবাহী ট্যাংকার, যেগুলো সম্মিলিতভাবে দৈনিক প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল বহন করতো।
বর্তমানে কেবলমাত্র সেইসব জাহাজকে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে, যাদের মালিকপক্ষ আইআরজিসির সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছেছে। বুধবার ইরান জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় তারা ২৬টি জাহাজের নিরাপদ চলাচল সমন্বয় করেছে। এর দুই দিন আগেই তেহরান ‘পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি (পিজিএসএ)’ নামে নতুন একটি কর্তৃপক্ষ গঠন করে, যার কাজ হবে প্রণালীর কার্যক্রম সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য সরবরাহ করা।
জাহাজপ্রতি ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত টোল
এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকেই তেহরান হরমুজ প্রণালী ব্যবহারের জন্য আনুষ্ঠানিক টোল ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেয়। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কিছু জাহাজের কাছ থেকে ইরান ইতোমধ্যে দুই মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ফি আদায় করেছে বলে জানা গেছে।
পশ্চিমা দেশগুলো এই অর্থ আদায়কে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বললেও, অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করছেন- প্রণালী বন্ধ থাকার দৈনিক ক্ষতির তুলনায় এই অর্থ অনেক কম।
প্রতিদিন ক্ষতি ১২২ বিলিয়ন ডলারের বেশি
যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হতো। দৈনিক প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে যেত, যা বৈশ্বিক সামুদ্রিক তেলবাণিজ্যের প্রায় ২৭ শতাংশ।
এছাড়া প্রতিদিন প্রায় ১০ বিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি পরিবাহিত হতো এই জলপথ দিয়ে।
যুদ্ধ শুরুর আগের দিন ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৭২ দশমিক ৪৮ ডলার। মার্চের শুরুতে ইরান প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার পর হাজারো জাহাজ আটকা পড়ে। হিসাব অনুযায়ী, শুধু তেল রফতানি বন্ধ থাকায় দৈনিক প্রায় ১১৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হচ্ছে। এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার কারণে আরও প্রায় ৭ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি যুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ, মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রতিদিন ১২২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
বর্তমানে শান্তিকালীন স্বাভাবিক নৌচলাচলের মাত্র ৪ শতাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পার হতে পারছে।
অবরোধের চেয়ে ইরানকে টোল দেওয়া সস্তা?
জার্মানির মারবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ রেজা ফারজানেগান বলেন, অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইরানের সঙ্গে সমঝোতা করে জাহাজ চলাচল চালু রাখা এখন অবরোধ অব্যাহত রাখার চেয়ে বেশি বাস্তবসম্মত।
তার ভাষায়, “ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ইরানের হাতে বড় ধরনের কৌশলগত প্রভাব রয়েছে। সাম্প্রতিক সংকট দেখিয়েছে, তেহরান বাস্তবিকভাবেই হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করতে সক্ষম।”
ইরানি-আমেরিকান অর্থনীতিবিদ নাদের হাবিবিও একই মত প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “কোনও সন্দেহ নেই যে, অবরোধে আটকে থাকার চেয়ে ইরানকে অর্থ দেওয়া অনেক সস্তা। কারণ, সমুদ্রে স্থির হয়ে থাকা একটি ট্যাংকার প্রতিদিন বিপুল অর্থক্ষতির মুখে পড়ে।”
তার মতে, জাহাজ আটকে থাকলে নাবিকদের বেতন, ঋণের কিস্তি, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং যুদ্ধঝুঁকি বিমার খরচ দ্রুত বেড়ে যায়।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, বিষয়টি শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিকও। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে অনেক কোম্পানি প্রকাশ্যে ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে যেতে চাইবে না।
আন্তর্জাতিক আইন কী বলে?
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, হরমুজের মতো প্রাকৃতিক প্রণালীতে অবাধ চলাচলের অধিকার সংরক্ষিত। সাধারণভাবে কোনও রাষ্ট্র এমন প্রণালী ব্যবহারের জন্য সরাসরি টোল আরোপ করতে পারে না।
তবে নিরাপত্তা, নৌ-নিয়ন্ত্রণ, উদ্ধার প্রস্তুতি কিংবা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার মতো সেবার জন্য ফি নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বিশ্বে এর বিভিন্ন উদাহরণ রয়েছে:
• পানামা খাল: এটি কৃত্রিম জলপথ। পানামা জাহাজের আকার ও পণ্য অনুযায়ী ফি নেয়। অনেক সময় এই ফি কয়েক মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হয়।
• সুয়েজ খাল: মিসর পরিচালিত এই কৃত্রিম খাল ব্যবহারের জন্যও বড় অঙ্কের অর্থ দিতে হয়।
• বসফরাস ও দারদানেলস প্রণালী: তুরস্ক প্রাকৃতিক এই প্রণালীগুলোতে সরাসরি টোল না নিলেও নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার জন্য ফি আদায় করে।
ফারজানেগানের মতে, ইরানও তুরস্কের মতো ‘নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার সেবার’ যুক্তি দেখিয়ে অর্থ আদায়ের একটি কাঠামো দাঁড় করাতে পারে।
তবে নাদের হাবিবির মতে, হরমুজের পরিস্থিতি ভিন্ন। কারণ এই প্রণালী শুধু ইরানের নয়; ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের জলসীমাও এর সঙ্গে যুক্ত। ফলে আঞ্চলিক সমঝোতা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি টোল ব্যবস্থা বাস্তবায়ন কঠিন হবে।
আঞ্চলিক সহযোগিতার সম্ভাবনা
সম্প্রতি পিজিএসএ হরমুজ প্রণালীর একটি নতুন মানচিত্র প্রকাশ করেছে, যেখানে ইরান, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সংশ্লিষ্ট জলসীমা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ফারজানেগানের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ইরান, কাতার, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি প্রস্তাব দিয়েছেন, একটি যৌথ সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষ গঠন করা যেতে পারে, যা নিরাপত্তা, জরুরি সমন্বয়, পরিবেশ সুরক্ষা এবং নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করবে।
তার মতে, “বিশ্ব যদি হরমুজ প্রণালীতে স্থিতিশীল ও নিরাপদ চলাচল চায়, তাহলে ইরানকে টোল দেওয়াকে হয়তো সেই স্থিতিশীলতার মূল্য হিসেবেই মেনে নিতে হবে।”