অন্তর্বর্তী সরকারের অবহেলায় হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১৩৮ শিশুর। প্রতিদিন হামের লক্ষণ নিয়ে সারা দেশের হাসপাতালে ভর্তি রোগী হাজার ছাড়িয়েছে। হাম আক্রান্ত রোগীদের সামাল দিতে হিমশিম অবস্থায় পড়েছেন হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে শিশুদের হামসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় টিকা না দেওয়ায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ অভিযোগে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ সব উপদেষ্টার বিচার দাবি করে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার জন্য আদালতে আইনি নোটিস দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে আড়াই দশকেরও বেশি সময় সরকারি ব্যবস্থাপনায় চলে আসা হামের টিকাদান কর্মসূচি বাতিলে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তকে ‘ফৌজদারি অবহেলা’ উল্লেখ করে এ সিদ্ধান্তের পেছনে ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা তদন্তে সরকারকে আইনি নোটিস পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে তদন্ত শুরু হলে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব ও সব উপদেষ্টা যাতে পালিয়ে যেতে না পারেন, সে জন্য তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চাওয়া হয়েছে নোটিসে। এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে হাই কোর্টে রিট করা হবে বলেও নোটিসে উল্লেখ করেছেন এই আইনজীবী।
গতকাল সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম নোটিসটি পাঠিয়েছেন। পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জনপ্রশাসন সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, স্বাস্থ্য সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সরকারের ৮টি দপ্তরে রেজিস্ট্রি ডাকে নোটিসটি পাঠানো হয়েছে। নোটিস পাওয়ার পাঁচ দিনের মধ্যে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, শিশু বিশেষজ্ঞসহ অংশীজনকে নিয়ে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করেছি। আর তদন্ত কমিটি গঠন করা হলে তদন্তাধীন অবস্থায় সাবেক প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা, সাবেক প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিবসহ অন্তর্বর্তী সরকারের সব উপদেষ্টা যাতে পালিয়ে যেতে না পারেন, সেজন্য তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে অনুরোধ করা হয়েছে। যদি তা না করা হয় তবে হাই কোর্টে রিট আবেদন করা হবে।
নোটিসে বলা হয়েছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) চালু করে সরকার। শুরুর দিকে যক্ষ্মা, ডিফথেরিয়া, হুপিং কাশি, ধনুষ্টংকার, পোলিও এবং হামের টিকা দেওয়া হতো। শহরকেন্দ্রিক এই কর্মসূচি ১৯৮৫ সাল থেকে গ্রাম পর্যায়ে সম্প্রসারণ করা হয়। বর্তমানে এই কর্মসূচির আওতায় ১০টি রোগের টিকা দেওয়া হয়। ২০১২ সালে হামের টিকার দ্বিতীয় ডোজ (এমসিভি২) চালু করা হয় এবং সুরক্ষা জোরদার করার জন্য হাম-রুবেলা (এমআর) টিকাও যুক্ত করা হয়।
কিন্তু সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার কেন পূর্ববর্তী সরকারগুলোর মতো একটি শক্তিশালী টিকাদান কর্মসূচি বাতিল করে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে নোটিসে। এতে বলা হয়েছে, ‘ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অপর্যাপ্ত টিকাদান, টিকা সংকট ও টিকাদান কর্মসূচি বাতিলের কারণে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সি শিশুদের মধ্যে হামসহ বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগম প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে টিকা আমদানির অনুরোধ জানিয়ে চিঠিও দিয়েছিলেন। কিন্তু সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ইচ্ছাকৃতভাবেই তা আমলে নেননি।’ ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে একজন অনৈতিক ব্যবসায়ী উল্লেখ করে নোটিসে বলা হয়েছে, ‘তিনি বাংলাদেশের জনগণের দুর্দশার ওপর ব্যবসা করে বিপুল মুনাফা অর্জনের একজন প্রধান হোতা। এই ধরনের ইচ্ছাকৃত ও উদ্দেশ্যমূলক অবহেলার (টিকা আমদানি না করা) ফলেই শত শত শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং অসংখ্য শিশু আজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।’ নোটিসে আরও বলা হয়েছে, ‘ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মূল উদ্দেশ্য ছিল সরকারি টিকাদান কর্মসূচি বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া। ফলে তার নেতৃত্বাধীন সরকারের এই ধরনের কর্মকান্ডের তদন্ত হওয়া এবং তদন্ত সাপেক্ষে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন।’
এ ছাড়া গতকাল রাজধানীর গুলশানে এক আলোচনা সভায় অন্তর্বর্তী সরকারের হাম প্রতিরোধের সার্বিক প্রস্তুতি পর্যালোচনা করলেই হামের প্রাদুর্ভাবের প্রকৃত কারণ জানা যাবে বলে মন্তব্য করেছেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের হাম প্রতিরোধের সার্বিক প্রস্তুতি পর্যালোচনা করলেই বের হয়ে আসবে হামের প্রাদুর্ভাবের প্রকৃত কারণ। ৪৯ দিনে দেশে হাম ছড়িয়ে যায়নি। ইউনূস সাহেব যাকে যেখানে বসিয়েছিলেন তারা ঠিকভাবে কাজ করেননি।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় (গত রবিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত) হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ২৮২ জন, মারা গেছেন পাঁচজন। গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৮ হাজার ৫৩৪ জন, মারা গেছেন ১৩৮ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম শনাক্ত হয়েছে ১৮০ জনের। এ পর্যন্ত হাম শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৯৯ জনের। গত ২৪ ঘণ্টায় দুজনের মৃত্যু হামের কারণে বলে নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
৯ দিন ধরে হামে আক্রান্ত দুই বছরের মেয়ে সিফাতকে নিয়ে মহাখালীর ডিএনসিসি কভিড হাসপাতালে আছেন টঙ্গীর হানুফা বেগম। তিনি বলেন, সিফাতের শরীরে লাল র্যাশ দেখা দেয় এবং জ্বর আসে। টঙ্গীর এক ক্লিনিকে ডাক্তার হামের উপসর্গ জানিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করতে বলেন। নোয়াখালী থেকে ঢাকায় এসে অন্য আরেক হাসপাতাল ঘুরে এখানে এসেছি। হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে মেয়েকে। জ্বর কিছুটা কমতে শুরু করেছে।
হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর রাজধানীর মহাখালীর ডিএনসিসি হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করেছে। গতকাল ওয়ার্ডে গিয়ে কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা অন্তত চারটি হাসপাতাল ঘুরে শয্যা না পেয়ে এখানে এসেছেন। রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে শয্যার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি রোগী। রোগীর চাপ সামলাতে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে আলাদা হাম ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। কিন্তু সেখানেও রোগীতে পরিপূর্ণ। সংক্রামক ব্যাধি হাম ছড়িয়ে পড়েছে দেশের ৫৬ জেলায়। শিশুদের সুরক্ষা নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে অভিভাবকদের। হামের প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে আনতে গত রবিবার থেকে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে সরকার।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক ডা. তানজিনা জাহান বলেন, ‘শিশুদের ক্ষেত্রে হামের পাশাপাশি নিউমোনিয়া ও তীব্র শ্বাসকষ্টের মতো জটিলতা দেখা দিচ্ছে। অনেক শিশুর মধ্যে পুষ্টির অভাব লক্ষ্য করা গেছে। আমাদের চিকিৎসকরা অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে সেবা দিচ্ছেন।’ বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ডে শয্যা আছে ৪৪টি। এই ওয়ার্ডের ভিতরেই আছে ১৬ শয্যার একটি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ)। মোট ৬০টি শয্যা হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য। কোনো শয্যা খালি নেই। গতকাল ৭১ জন হামের রোগী ভর্তি ছিল এ হাসপাতালে। গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছেন ১২ জন। ডিএনসিসি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, বেশির ভাগ রোগী আইসিইউ ও এনআইসিইউ না পেয়ে বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে এই হাসপাতালে আসছে চিকিৎসার জন্য। রোগী বেড়ে যাওয়ায় বিশেষায়িত আইসিইউ ও শয্যার সীমাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে। এখানে একটি শয্যা খালি হলে অন্য একটি শিশুকে ভর্তি করা হচ্ছে।
হাম রোগে আরও তিন শিশুর মৃত্যু : হাম রোগে ২৪ ঘণ্টায় আরও তিন শিশু মারা গেছে এবং হাসপাতালে নতুন করে আরও রোগী ভর্তি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
রাজশাহী : রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে হাম রোগের উপসর্গ নিয়ে আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালটিতে এখন হামের উপসর্গ নিয়ে ১৩৮ শিশু চিকিৎসাধীন। গতকাল দুপুরে হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি জানান, রবিবার দুপুর থেকে আজ (সোমবার) দুপুর পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে এ দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ২০ শিশু ভর্তি হয়েছে। আর সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে পাঁচ শিশু। হাসপাতালটিতে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে ৪১১ শিশু। আর চিকিৎসাধীন অবস্থায় এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৪২ শিশু।
সিলেট : সিলেটে হামের উপসর্গ নিয়ে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। গতকাল দুপুরে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুই মাস বয়সি এক শিশু মারা গেছে। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল উমর রাশেদ মুনির জানান, দুই দিন আগে হাম ও হৃদযন্ত্রের জটিলতা নিয়ে ওই শিশুটিকে ওসমানী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে তাকে আইসিইউতে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ছাড়া গতকাল সকাল পর্যন্ত সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে ভর্তি ছিল ১০১ জন। রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় গতকাল থেকে ওসমানী হাসপাতালে ১০ শয্যার আইসোলেশন সেন্টার চালু করা হয়েছে। এর আগে ২৬ মার্চ শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ১০০ শয্যার আইসোলেশন চালু করা হয়।
রংপুর : রংপুর বিভাগে ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ থাকা ৩৩ রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং ১৪ জন বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছে। রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক কার্যালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় রংপুর বিভাগের দিনাজপুরে ১৬, গাইবান্ধায় ৩ রোগী শনাক্তসহ রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১২ ও দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২ রোগী ভর্তি হয়েছে।
রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. গাউসুল আজম বলেন, সারা দেশের হামের নমুনা পরীক্ষা ঢাকায় হয়। এজন্য ফলাফল আসতে একটু সময় লাগছে। এ অবস্থায় সরকার উদ্যোগ নিয়ে বিভাগীয় শহরগুলোতে হাম পরীক্ষার ল্যাব স্থাপন করলে ভুক্তভোগীদের উপকার হতে পারে।