মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের মাঝে গতকাল জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ভাষণে ইরানে চরম আঘাত হানার হুমকি দিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা শিগগিরই তাদের প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাব, যেখানে তাদের থাকা উচিত।’ এর পরপরই ইসরায়েলজুড়ে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। লক্ষ্যবস্তু করা হয় রাজধানী তেল আবিব, বন্দর নগরী হাইফাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। জাতির উদ্দেশে দেওয়া ট্রাম্পের ভাষণকে ‘উদ্ভট, ভয়াবহ, অশুভ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ডেমোক্রেটিক পার্টির কংগ্রেস সদস্যরা। একই সঙ্গে তাঁরা ট্রাম্পকে যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বের জন্য ‘এক বিপদ’ বলে মন্তব্য করেন। এদিকে বিমান হামলা চালিয়ে ইরানের ৪০টি অস্ত্র কারখানা গুঁড়িয়ে দেওয়ার দাবি করেছে ইসরায়েল। জবাবে ইরান বলেছে, দেশটির মূল সামরিক সরঞ্জাম এমন স্থানে রয়েছে যেখানে শত্রুপক্ষ কখনোই পৌঁছাতে পারবে না এবং সেগুলো এখনো অক্ষত রয়েছে।
গতকাল জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে অত্যন্ত দ্রুত সময়ের মধ্যে আমেরিকার সব সামরিক লক্ষ্যমাত্রা পূরণের পথে রয়েছে। আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে আমরা তাদের ওপর অত্যন্ত কঠোর আঘাত হানতে যাচ্ছি। আমরা শিগগিরই তাদের প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাব, যেখানে তাদের থাকা উচিত।’ এর মধ্যেও ইরানের সঙ্গে আলোচনা চলছে জানিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘এই সময়ের মধ্যে যদি কোনো সমঝোতা না হয়, তবে আমাদের নজর গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুগুলোর ওপর রয়েছে। যদি কোনো চুক্তি না হয়, তবে আমরা তাদের প্রতিটি বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রে অত্যন্ত কঠোরভাবে একই সঙ্গে আঘাত হানব।’
তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের তেলের ওপর আঘাত করিনি, যদিও সেটিই ছিল সব থেকে সহজ লক্ষ্যবস্তু; কারণ তা করলে তাদের বেঁচে থাকার বা পুনর্গঠনের সামান্যতম সুযোগও থাকত না। কিন্তু চাইলেই সেখানে আঘাত করতে পারতাম, আর তা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যেত এবং এ ব্যাপারে তাদের কিছুই করার থাকত না।’ ইরান বিধ্বস্ত হয়ে গেছে এবং মূলত এটি এখন আর কোনো হুমকি নয় বলেও মন্তব্য করেন ট্রাম্প। ইরানের নতুন নেতৃত্ব কম উগ্র ও অনেক বেশি যুক্তিবাদী উল্লেখ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন আমাদের লক্ষ্য ছিল না। তাদের মূল নেতার মৃত্যুর কারণে শাসনব্যবস্থায় একটি পরিবর্তন ঘটেছে। নতুন নেতারা কম উগ্রপন্থি এবং অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য। প্রায় ২০ মিনিটের ওই ভাষণে ডোনাল্ড ট্রাম্প মিত্র দেশগুলোকে হরমুজ প্রণালিতে নৌনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘সাহস সঞ্চয় করার’ আহ্বান জানান। ট্রাম্প বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রায় কোনো তেলই আমদানি করে না এবং ভবিষ্যতেও করবে না। আমাদের এর প্রয়োজন নেই। আর বিশ্বের যেসব দেশ হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে তেল পায়, সেই পথটি দেখভালের দায়িত্ব তাদেরই নিতে হবে।’
জাতির উদ্দেশে দেওয়া ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ভাষণকে ‘উদ্ভট, ভয়াবহ, অশুভ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ডেমোক্রেটিক পার্টির কংগ্রেস সদস্যরা। একই সঙ্গে তারা ট্রাম্পকে যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বের জন্য ‘এক বিপদ’ বলে মন্তব্য করেন। কংগ্রেসম্যান জিম হাইমস বলেন, ‘ট্রাম্পের ভাষণ শেষ হওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যেই তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ৫ ডলার বেড়ে গেছে। ট্রুথ সোশ্যাল-এ আজ এক উত্তাল রাত কাটবে। আর তিনি (ট্রাম্প) আসলে কী বলেছেন, সে বিষয়ে আমি এখনো নিশ্চিত নই।’ সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেন বলেন, ট্রাম্প যখন দুই সপ্তাহ আগে দাবি করেছিলেন আমরা জিতেছি, তখন তিনি আমেরিকার মানুষের কাছে মিথ্যা বলেছিলেন। কংগ্রেসম্যান লয়েড ডগেট বলেন, ট্রাম্পের ভাষণের মধ্যে ‘সবচেয়ে বড় মিথ্যাটি’ খুঁজে বের করা কঠিন। তবে যুক্তরাষ্ট্রে ‘কোনো মুদ্রাস্ফীতি নেই’ বলে তাঁর দাবিটিই সম্ভবত জয়ী হবে।
জাতির উদ্দেশে দেওয়া ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষণ শেষ হওয়ার পরপরই ইসরায়েলজুড়ে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান।
এদিকে বিমান হামলা চালিয়ে ইরানের ৪০টি অস্ত্র কারখানা ও সংরক্ষণাগার গুঁড়িয়ে দেওয়ার দাবি করেছে ইসরায়েল। তেল আবিব বলছে, বিশেষ অভিযানে তেহরানের উন্নত বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং ব্যালিস্টিক মিসাইল সংরক্ষণের জায়গাগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে ইসরায়েলের এই দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। তেহরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর যৌথ হামলায় ইরানের সামরিক স্থাপনায় ‘সামান্য’ ক্ষতি হয়েছে। ইরানের মূল সামরিক সরঞ্জাম এমন স্থানে রয়েছে যেখানে শত্রুপক্ষ কখনোই পৌঁছাতে পারবে না এবং সেগুলো এখনো অক্ষত রয়েছে বলে মন্তব্য করা হয়েছে। দেশটির খাতাম আল-আম্বিয়া সদর দপ্তরের মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাঘারি এক বিবৃতিতে বলেন, ‘যেসব কেন্দ্রকে আপনারা লক্ষ্যবস্তু মনে করছেন, সেগুলো তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমাদের কৌশলগত সামরিক সরঞ্জাম এমন স্থানে উৎপাদিত হয়, যেগুলো সম্পর্কে আপনারা কিছুই জানেন না এবং কখনো সেখানে পৌঁছাতেও পারবেন না।’